‘তোমায় গান শুনাব’ মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

khwগোপাল সিং, খোয়াই, ১২ জুলাই ।। ২২শে শ্রাবণ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু দিনটি বিশ্বের ইতিহাসে একটি ব্যাতিক্রমী দিন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর ২০টি দিন ছিল খুবই বেদনাদায়ক। প্রতিটি দিনকে একটি গীতিনাট্য করা যায়, যা বর্ণনা করার ভাষা নেই। শ্রাবণ-আষাঢ় মাসে বর্ষা এলেই মনে পড়ে যায় মেঘ-বর্ষার কথা। যা খোয়াইয়ের দর্শকদের প্রাণ ভরিয়ে দিয়ে গেল এবং প্রমান করে গেল রবীন্দ্র প্রেম হারিয়ে যায়নি ত্রিপুরাবাসীর বুক থেকে। রবীন্দ্র প্রেম চির অম্লান। বুধবার রথযাত্রার সন্ধ্যায় খোয়াই টাউন হলে স্থানীয় কালচার্যাল ক্যাম্পেন এর উদ্যোগে রবীন্দ্র কথা ও গানে মেঘ-বর্ষণ শ্রাবণী সেনের কণ্ঠে ‘তোমায় গান শুনাব’ এই মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এরই জানান দিয়ে গেল। সরবাণী নন্দী’র গীতিনাট্য পরিবেশন দর্শকদের মন ভরিয়ে তুলে। সরবানী নন্দীর এই কলা শুধু খোয়াইতেই নয়, দেশের যেকোন প্রান্তেই প্রশংসা কুড়াবে বলেই অভিমত সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের। অপরদিকে হল ভর্ত্তি দর্শক পেয়ে এদিন আপ্লুত দেখাল শ্রাবনী সেনকেও। বিগত কয়েক বছরে আমন্ত্রন পত্র হাতে পেয়েও যেখানে দর্শক টানা সম্ভব হয়নি, সেখানে কিন্তু রবীন্দ্র সঙ্গীতের এমন অনুষ্ঠানে টিকিট কেটে দর্শকদের এত বড় উপস্থিতির হার এক নতুন অধ্যায় রচনা করল বলেই মনে করছেন খোয়াইয়ের সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষজন। বিগত বহু বছর ধরেই দেশের বিভিন্ন রাজ্যগুলি থেকে বহু নাট্যদল, কালচার্যাল টিম এসে খোয়াই টাউন হলে অভিনয় কিংবা মনোজ্ঞ সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান করে গেলেও দর্শক আসন ফাঁকাই ছিল। এমনকি নাট্যোৎসবও দর্শক টানতে পারেনা আজকাল। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বুধবারের সন্ধ্যা খোয়াইয়ের সংস্কৃতি জগতকে একটু নাড়া দিয়ে গেল। কিন্তু সেদিন আর এদিনের মধ্যে কি সেই তফাত? যেখানে জনাকয়েক দর্শক নিয়ে এতকাল খোয়াই টাউন হল মঞ্চ বড় বড় অনুষ্ঠানের সাক্ষী হয়ে থাকল, সেখানে শ্রাবনী সেনের কণ্ঠে ‘তোমায় গান শুনাব’ সঙ্গীতানুষ্ঠানটি এমন কি জাদু ছড়ালো যা এক যুগের শূন্যতাকে পেছনে ফেলে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে গেল? সংস্কৃতী প্রেমী দর্শকের মতে অনুষ্ঠানটি ছিল নির্দলীয়, তাই সকল অংশের মানুষ সেই সুযোগ বগলদাবা করে নেন। এমন সুযোগ বাড়ে বাড়ে আসেনা। তবে একসময়কার বৈভব কেন শূন্যতায় পরিনত হয়েছিল এর পেছনে অনেক কারন রয়েছে যা বহুবার জনসমক্ষে এসেছে। কিন্তু দর্শক স্রোতাদের কণ্ঠে যদি একটি জ্বলজ্যান্ত কারন বা উদাহরন তুলে ধরতে হয় তবে বলতেই হয় আয়োজকদের ভারী একটা গলদের কথা। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুতে এবং মুল অনুষ্ঠানের আগে আয়াজকরা নিজেদের জাহির করতে এমনভাবে সময়ের অপচয় করেন যা দর্শকরা সহ্য করতে করতে একসময় টাউন হল মঞ্চ থেকেই বিমূখ হয়ে পড়েন। আয়োজকরা নিজেদের জাহির করতে গিয়ে নিজেদের আলোচনাকে রাবারের মতো টানতে টানতে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতম করেই চলেন। মুল অনুষ্ঠানের সময়সূচী কখন ঘন্টার পর ঘন্টা পিছুতে থাকে আয়োজকরা সেদিকে মনোযোগই দেন না। যে অনুষ্ঠান দেখতে, উপভোগ করতে দর্শকরা এলেন, সেই অনুষ্ঠানের পরিমান গিয়ে কোথায় ঠেকল তা কখনই কোন আয়োজক ভেবে দেখেননি। ধৈর্য্যহারা হতে হতে তবেই কিন্তু নীরবে কেটে পড়লেন দর্শকরা। টাউন হল বিমূখতা এমনিতেই আসেনি। সময়ের অপচয়ের কারনে সন্ধ্যা-রাত থেকে গভীর রাত অবধি চলা অনুষ্ঠান শেষের পর যানবাহনের অভাবে সমস্যায় পড়তে হয় অনুষ্ঠানে আগত অধিকাংশ মানুষকেই। এর মধ্যে অনেকেরই নিজস্ব যান নাও থাকতে পারে। ভরসা কিন্তু অটো বা বর্তমান সময়ের টমটম সহ অন্যান্য ছোট যানবাহনই। কিন্তু দর্শকের চিন্তা না করেই যে উদ্যোক্তা বা আয়োজকরা নিজেদের জাহির করতে ব্যষ্ত হয়ে পড়েন তাদের ক্রমাগত এই ভূলের খেশাত দিতে হচ্ছে খোয়াইয়ের সংস্কৃতি জগতকে। কিন্তু ডটকমের যুগের দোহাই দিয়ে যারা দর্শক আসন শূন্যতার বিষয়ে কটাক্ষ করেন তারা বুধবার সন্ধ্যায় খোয়াই টাউন হল ভর্ত্তি দর্শকসমাগমকে দেখে কি বলবেন? প্রশ্ন সংস্কৃতিপ্রেমীদের। যদিও এদিনও সঠিক সময়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়নি। মুল অনুষ্ঠানকে পেছনে ঠেলে আয়োজকদের নিজেদের জাহির করার দৌড় এদিনও জারি ছিল। দর্শকরা কিছু সময়ের জন্য ধৈর্য্যহারা হলেও শ্রাবনী সেনের কণ্ঠে রবীন্দ্র সঙ্গীতের আবহে সব নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু মাঝে মাঝেই বাদ সাধে টাউন হলের সাউন্ড-সিস্টেম, আলোর ত্রুটিগুলি। শ্রাবনী সেনের প্রথম গানেই সাউন্ড সিস্টেমের গোলযোগ দেখা দেয়। যেকারনে শ্রাবনী সেন নিজেই একসময় বলে উঠলেন – ‘আমি আর গান গাইতে পারব না।’ সাউন্ড সিস্টেমের এমন দূর্দশা এর আগে তিনি হয়তো খুব বেশী উপভোগ করেননি। যদিও পরবর্তী সময় শ্রাবনী সেন উনার রবীন্দ্র সঙ্গীতের মূর্ছনায় দর্শকদের মাতিয়ে তোলেন। কুড়িয়ে নেন দর্শকদের প্রশংসা ও অসংখ্যা করতালি।  তবে হঠাৎ বৃষ্টির মতন ব্যাপক হারে খোয়াই টাউন হলে দর্শক সমাগম নিয়ে কালচার্যাল ক্যাম্পেন এবং আজকের এই অনুষ্ঠানকে নির্দল হিসাবে বিবেচনা করার কথা বললেন অনেকেই। খোয়াই শহরে যে সংস্কৃতিপ্রেমী দর্শক-স্রোতা হারিয়ে যায়নি বুধবারের সন্ধ্যা তার ঐতিহাসিক সাক্ষী হয়ে রইল। শুধু ভাল অনুষ্ঠান এবং আয়োজকের অভাব রয়েছে বলেই মনে করছেন তারা। ডটকমের যুগেও যে খোয়াইয়ের সংস্কৃতি প্রেমী মানুষের ভাল অনুষ্ঠানের প্রতি মোহ হারিয়ে যায়নি, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। শুধুমাত্র যোগ্য আয়োজক এবং মুল অনুষ্ঠানের প্রতি জোর দেওয়ার মতো প্রবল ইচ্ছা শক্তি থাকাটা বাঞ্ছনীয়। সময় নিয়ে যতটা ওয়াকিবহাল থাকা চাই, বরং নিজেদের জাহির করার প্রবনতাকে হ্রাস করে মুল অনুষ্ঠানের প্রতি জোর দেওয়ার প্রতি ততটাই তৎপর থাকতে হবে। তাহলেই সংস্কৃতিপ্রেমী খোয়াইয়ের আপামর মানুষজনকে যেকোন অনুষ্ঠানের দর্শকের আসেন ফিরে পাতে পারে আয়োজকরা। এমনটাই অভিমত খোয়াইয়ের আপামর সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*