নবারুণ চক্রবর্তী, সাব্রুম, ১৯ সেপ্টেম্বর || পরিবেশ সুরক্ষা ও ওজোন স্তর রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বুধবার সাব্রুমে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হলো বিশ্ব ওজোন দিবস। প্রতিবছর ১৬ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে এই দিবসটি পালন করা হয়। ১৯৮৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ওজোন স্তর ক্ষয়কারী পদার্থের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত মন্ট্রিয়ল প্রোটোকলের স্মরণেই দিনটি পালিত হয়।
এ বছর বিশ্ব ওজোন দিবসের মূল বার্তা “একটি শীতলতর গ্রহের জন্য বৈশ্বিক পদক্ষেপ”। ২০১৬ সালে গৃহীত কিগালি সংশোধনীর দশম বার্ষিকীকে সামনে রেখে এবারের আলোচনায় টেকসই শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই উপলক্ষে সাব্রুমে প্রাক্তন বিদ্যালয় পরিদর্শক দুলাল দাস এবং পিএম শ্রী সাব্রুম উচ্চতর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক রঞ্জন দেবনাথ ওজোন স্তরের গুরুত্ব, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে বক্তব্য রাখেন।
বক্তব্য রাখতে গিয়ে দুলাল দাস বলেন, ওজোন স্তর পৃথিবীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি-বি (UV-B) রশ্মির বড় অংশ আটকে দিয়ে এটি মানবস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য, সামুদ্রিক জীবন এবং স্থলজ বাস্তুতন্ত্রকে সুরক্ষা দেয়। তাই শুধু বিশ্ব ওজোন দিবসেই নয়, সারা বছর সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশ ও ওজোন স্তর রক্ষার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশ রক্ষায় ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয় থেকেই পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন, বৃক্ষরোপণ, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
অন্যদিকে রঞ্জন দেবনাথ বলেন, ওজোন স্তর রক্ষা শুধু পরিবেশের বিষয় নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও ওজোন সুরক্ষার বিষয়গুলোকে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে হবে।
তিনি জানান, অতিরিক্ত UV-B বিকিরণ মানুষের স্বাস্থ্যের পাশাপাশি কৃষি, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রত্যেককে নিজের অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে সমাজে পরিবেশ সচেতনতার দূত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, মন্ট্রিয়ল প্রোটোকল বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি। এর মাধ্যমে ক্লোরোফ্লোরোকার্বন (CFC) সহ বিভিন্ন ওজোন-ক্ষয়কারী পদার্থের ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৯ সালে ভিয়েনা কনভেনশন ও মন্ট্রিয়ল প্রোটোকল জাতিসংঘের ইতিহাসে প্রথম পরিবেশগত চুক্তি হিসেবে বিশ্বের প্রতিটি দেশের অনুমোদন লাভ করে।
এছাড়া ২০১৬ সালের কিগালি সংশোধনীর মাধ্যমে হাইড্রোফ্লুরোকার্বন (HFC)-এর ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। HFC ওজোন স্তর ক্ষয় না করলেও এটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। ফলে ওজোন স্তর সুরক্ষার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাতেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং দেশগুলির নিয়ম মেনে চলার ফলে ওজোন স্তর ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে। বর্তমান উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ওজোন স্তর ১৯৮০ সালের স্তরের কাছাকাছি ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্ব ওজোন দিবসের বার্তা তাই স্পষ্ট—ওজোন স্তর রক্ষা মানে শুধু আকাশের একটি স্তরকে রক্ষা করা নয়; বরং মানবস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
