আপডেট প্রতিনিধি, আগরতলা, ৩১ মে || প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা, সিপিআই ত্রিপুরা রাজ্য পরিষদের প্রাক্তন রাজ্য কন্ট্রোল কমিশনের চেয়ারম্যান এবং বর্ষীয়ান গণআন্দোলনের নেতা রমেন্দ্র দত্ত গুপ্তের প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে রাজ্যের বামপন্থী রাজনৈতিক মহলে। রবিবার ভোর আনুমানিক ৫টা ৪৫ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন।
সবার কাছে ‘রুনু বাবু’ নামে পরিচিত রমেন্দ্র দত্ত গুপ্ত ছাত্রজীবন থেকেই বামপন্থী আদর্শে উদ্বুদ্ধ ছিলেন। অবিভক্ত ভারতের নোয়াখালী জেলায় জন্মগ্রহণকারী রমেন্দ্র দত্ত গুপ্ত দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে ত্রিপুরার বিলোনিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ছাত্রাবস্থায় অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস ফেডারেশন (AISF)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীকালে দক্ষিণ ত্রিপুরার বিশিষ্ট কমিউনিস্ট নেতা জুনু দাসের সান্নিধ্যে এসে সিপিআই-এর আদর্শ ও সংগ্রামের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হন।
সরকারি চাকরিজীবনে থেকেও তিনি কর্মচারী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ত্রিপুরা সরকারি কর্মচারী সমিতি এবং সমন্বয় কমিটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই)-এর সদস্যপদ গ্রহণ করেন। কর্মচারী আন্দোলনের পাশাপাশি ক্রীড়া, শরীরচর্চা এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল।
অবসর গ্রহণের পর তিনি পূর্ণ সময়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আত্মনিয়োগ করেন। সিপিআই বিলোনিয়া বিভাগীয় পরিষদ, বিভাগীয় কার্যকরী পরিষদ এবং সহ-সম্পাদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পরে আগরতলায় এসে সিপিআই ত্রিপুরা রাজ্য পরিষদ ও রাজ্য কার্যকরী পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৭ সালে কুমারঘাটে অনুষ্ঠিত সিপিআই-এর ১৮তম রাজ্য সম্মেলনে তাঁকে রাজ্য কন্ট্রোল কমিশনের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনি নিষ্ঠা, সততা এবং আদর্শিক দৃঢ়তার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করেন। সিপিআই-এর শতবর্ষ উপলক্ষে ২০২৫ সালে তাঁকে বিশেষভাবে সংবর্ধিত করা হয়েছিল।
তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই উজান অভয়নগরস্থিত তাঁর বাসভবনে ছুটে যান সিপিআই-এর রাজ্য নেতৃত্ব, আত্মীয়-পরিজন, শুভানুধ্যায়ী ও গুণমুগ্ধরা। পরে বেলা ১১টায় তাঁর মরদেহ সিপিআই রাজ্য দপ্তর জুনু দাস ভবনে নিয়ে আসা হয়। সেখানে দলীয় লাল পতাকা দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সিপিআই রাজ্য সম্পাদক মিলন বৈদ্য, রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ধনমনী সিনহা, সুব্রত দেবনাথ, অহিদ মিঞা, তুলসী দাস কপালি, বিক্রমজিৎ সেনগুপ্ত, সিপিআই(এম) নেতা নারায়ণ কর, সিপিআই রাজ্য পরিষদের সদস্য অরুণ সেনগুপ্ত, বিশিষ্ট আইনজীবী পুরুষোত্তম রায় বর্মন, মানবাধিকার আন্দোলনের নেতা মৃন্ময় চক্রবর্তী, টিজিইএ-র নেতা স্বপন পোদ্দার, এআইএসএফ নেতা শুভদীপ মজুমদার, সায়ন পাল, এআইওয়াইএফ নেতা রাকেশ দাসসহ বহু রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
মৃত্যুকালে তিনি পুত্রবধূ, নাতনি এবং অসংখ্য আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও শুভানুধ্যায়ীদের রেখে গেছেন। তাঁর স্ত্রী এবং একমাত্র পুত্র পূর্বেই প্রয়াত হয়েছেন।
রমেন্দ্র দত্ত গুপ্তের মৃত্যুতে ত্রিপুরার বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন এক অভিজ্ঞ, সৎ এবং সংগ্রামী নেতাকে হারালো বলে রাজনৈতিক মহলের অভিমত। তাঁর আদর্শ, রাজনৈতিক সততা এবং সংগঠনের প্রতি দায়বদ্ধতা আগামী প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
সিপিআই ত্রিপুরা রাজ্য পরিষদের পক্ষ থেকে প্রয়াত নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করা হয়েছে।
