সুসমাচার প্রচারে জীবনের ছয় দশকেরও বেশি সময় উৎসর্গ, অবসরে রেভারেন্ড মারবম তাসার

জাতীয় ডেস্ক, অরুণাচল প্রদেশ, ০৫ নভেম্বর || ব্যক্তিগত স্বপ্ন, আর্থিক সচ্ছলতা কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠা নয়, জীবনের দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় যিনি উৎসর্গ করেছেন ঈশ্বরের বাণী প্রচার এবং যিশুখ্রিস্টের সুসমাচার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে, তিনি রেভারেন্ড মারবম তাসার। খ্রিস্টীয় সমাজে ‘ডিকন তাবম’ নামেও পরিচিত এই ধর্মপ্রচারকের জীবন সংগ্রাম, ত্যাগ, অধ্যবসায় ও অটল বিশ্বাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। জীবনের শুরুতে ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও পরিস্থিতির পরিক্রমায় তিনি বেছে নিয়েছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথ। সেই পথ ছিল ঈশ্বরের সেবা, মানুষের মধ্যে সুসমাচার প্রচার এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে খ্রিস্টীয় সমাজ গড়ে তোলার পথ। ধর্মপ্রচারের কারণে বারবার বাধা, গ্রেপ্তার, হুমকি ও নিগ্রহের সম্মুখীন হয়েও তিনি কখনও নিজের বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি। দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রায় ২,৫০০ জনকে বাপ্তিস্ম প্রদান এবং অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খ্রিস্টীয় সম্প্রদায়ের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে এবার সক্রিয় চার্চ মন্ত্রণালয় থেকে অবসরের এক বিশেষ অধ্যায়ে পৌঁছেছেন তিনি।

১৯৪৭ সালের ২০ আগস্ট অরুণাচল প্রদেশের বর্তমান লেপ্পা রাদা জেলার লেতে গ্রামে কেমার ও কাবিন তাসারের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মারবম তাসার। শৈশবেই পিতৃহারা হন তিনি। এরপর মা কাবিন এবং বড় ভাই মার্নিয়ার স্নেহ, যত্ন ও সহযোগিতায় বেড়ে ওঠেন। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের আর্থিক প্রতিকূলতা উপলব্ধি করতে হয় তাঁকে। জীবিকা নির্বাহ এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য অল্প বয়স থেকেই বিভিন্ন কাজে যুক্ত হন। কঠোর পরিশ্রম, উদ্যোগী মনোভাব ও অধ্যবসায়ের কারণে যে কোনও কাজে তিনি সাফল্যের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারতেন। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে একসময় সরকারি নির্মাণ ও সরবরাহ সংক্রান্ত ঠিকাদারি ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার উদ্যোগ নেন। সেই উদ্দেশ্যেই রোয়িংয়ে যান তিনি। সেখানে নিজের ঘনিষ্ঠ খ্রিস্টান আত্মীয় রিকন্যা ও ইয়াপু তাসারের বাড়িতে কয়েক মাস থাকার সুযোগ হয়। তাঁরা দুজনেই কৃষি দপ্তরে কর্মরত ছিলেন এবং অগ্রণী চার্চ প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁদের খ্রিস্টীয় জীবনযাপন, প্রার্থনা এবং ঈশ্বরের প্রতি গভীর বিশ্বাস তরুণ মারবমের মনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। তাঁদের আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনায় যিশুখ্রিস্টকে নিজের ব্যক্তিগত প্রভু ও ত্রাণকর্তা হিসেবে গ্রহণ করেন তিনি। ১৯৬৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রথমবার রোয়িংয়ের রায়াং ব্যাপটিস্ট চার্চে রবিবারের উপাসনায় অংশগ্রহণ করেন। এই দিনটি তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। খ্রিস্টীয় বিশ্বাসে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি নিজের গ্রামে ফিরে আসেন এবং সহগ্রামবাসীদের মধ্যে যিশুখ্রিস্টের সুসমাচার প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

তাঁর এই উদ্যোগের ফলস্বরূপ ১৯৬৮ সালের ৬ জুন লিপু গেকো নামের একটি কেন্দ্রীয় পাহাড়ি স্থানে তিনটি গ্রামের মানুষের জন্য একটি যৌথ চার্চ প্রতিষ্ঠিত হয়। নবগঠিত খ্রিস্টীয় মণ্ডলীর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান মারবম। কিন্তু সেই সময়ে খ্রিস্টধর্মের প্রচার এবং চার্চ প্রতিষ্ঠার পথ ছিল অত্যন্ত কঠিন। ধর্মীয় বিরোধিতা ও সামাজিক প্রতিকূলতার কারণে তাঁকে একাধিকবার হুমকি, জিজ্ঞাসাবাদ ও গ্রেপ্তারের সম্মুখীন হতে হয়। ১৯৬৮ সালের আগস্ট মাসে নিয়গাম গ্রামে তাঁকে তলব করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। একই বছরের নভেম্বর মাসে তাঁকে গ্রেপ্তার করে আয়ালোতে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে বাটেরিজোতে ধানচাষের জমি সংক্রান্ত বিরোধ মীমাংসার জন্য একটি বড় জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ডেপুটি কমিশনার চলে যাওয়ার পর তাঁর ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের বিরোধীরা সেই সুযোগে তাঁকে পুনরায় আটক করে। এরপর আয়ালোতে পলিটিক্যাল ইন্টারপ্রিটারের বাসভবনে আরও প্রায় দুই সপ্তাহ তাঁকে আটক থাকতে হয়। পরপর গ্রেপ্তার, হুমকি ও প্রতিকূল পরিস্থিতি একজন সদ্য খ্রিস্টধর্ম গ্রহণকারী যুবককে সহজেই নিরুৎসাহিত করতে পারত। কিন্তু মারবম তাসারের ক্ষেত্রে ঘটেছিল সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা। প্রতিটি বাধা তাঁর বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে এবং ঈশ্বরের সেবায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করার সংকল্পকে শক্তিশালী করে তোলে।

১৯৬৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর লেতে গ্রামের খ্রিস্টান বাসিন্দারা নিজেদের গ্রামেই একটি চার্চ নির্মাণ করেন। উল্লেখ্য, লেতে গ্রামের বাসিন্দারা ১৯৬৮ সালেই খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং লিপু গেকোর যৌথ চার্চ প্রতিষ্ঠার আগেও তাঁদের নিজস্ব খ্রিস্টীয় উপাসনার ধারা ছিল। তা সত্ত্বেও লেতে এবং পার্শ্ববর্তী দুটি গ্রামের মানুষ একসঙ্গে উপাসনা চালিয়ে যান। এই তিনটি গ্রামই তিরবিন অঞ্চলের প্রথম খ্রিস্টীয় মণ্ডলী গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৬৯ সালের ১৪ নভেম্বর লেতে গ্রামের নেগেনসি নদীতে বাপ্তিস্ম গ্রহণ করেন মারবম তাসার। এর মধ্য দিয়ে যিশুখ্রিস্টের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ও অঙ্গীকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ পায়।

এরপর ১৯৭০ সালের মার্চ মাসে তাঁর জীবনে আরও একটি বড় পরীক্ষা আসে। সরকারিভাবে তাঁকে জানানো হয়, ধর্মপ্রচার বন্ধ না করলে তাঁর দোকানের ব্যবসায়িক লাইসেন্স বাতিল করা হবে। একদিকে নিজের ব্যবসা ও জীবিকার ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে ঈশ্বরের বাণী প্রচারের দায়িত্ব—এই দুইয়ের মধ্যে তাঁকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু কোনও দ্বিধা না করে তিনি সুসমাচার প্রচারের পথকেই বেছে নেন। নিজের একমাত্র নিয়মিত আয়ের উৎস ব্যবসায়িক লাইসেন্স এবং সদ্য নির্মিত দোকানঘর ছোট ভাইয়ের হাতে তুলে দেন। আজও সেই দোকানঘর তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্য ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগের স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই সময় ব্যক্তিগত জীবনেও গভীর শোকের সম্মুখীন হন তিনি। মাত্র তিন বছর বয়সে তাঁর বড় ছেলে বমকারের মৃত্যু পরিবারে গভীর শূন্যতা তৈরি করে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের এই মর্মান্তিক আঘাতও তাঁর বিশ্বাস ও ধর্মীয় দায়িত্ববোধকে দুর্বল করতে পারেনি।

১৯৭১ সালে মারবম তাসার প্রি-ইভাঞ্জেলিস্ট হিসেবে ঈশ্বরের সেবায় আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেন। লিপু গেকো খ্রিস্টীয় সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান জীবিত নেতা হিসেবে তিনি ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময় তাঁর মাসিক সম্মানী ছিল মাত্র ২৫ টাকা। আর্থিক প্রাপ্তি কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা তাঁর কাছে কখনও মুখ্য হয়ে ওঠেনি। মানুষের আধ্যাত্মিক পরিবর্তন, নতুন চার্চ প্রতিষ্ঠা এবং যিশুখ্রিস্টের বাণী প্রত্যন্ত জনপদে পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁর জীবনের প্রধান লক্ষ্য। তাঁর দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা ও অভিজ্ঞতার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৭ সালের ২৪ এপ্রিল অসমের ডুমডুমার পানিকুয়া মিশন সেন্টারে দিবাং লোহিত ব্যাপটিস্ট চার্চেস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে তাঁর ইভাঞ্জেলিস্ট লাইসেন্স অনুমোদন করা হয়। এরপর আরও বিস্তৃত পরিসরে ধর্মপ্রচারের কাজে যুক্ত হন তিনি।

অরুণাচল প্রদেশের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলিতে সুসমাচার পৌঁছে দিতে তাঁকে অসাধারণ শারীরিক কষ্ট ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পথ চলতে হয়েছে। কখনও কাঠবোঝাই ট্রাক, কখনও ট্রাক্টর কিংবা বাসে চড়ে, আবার কখনও দিনের পর দিন পায়ে হেঁটে পৌঁছে গিয়েছেন প্রত্যন্ত জনপদে। কাঁধের ব্যাগে বাইবেলের অসমীয়া অনুবাদ এবং হাতে একটি টর্চ ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। দিনের পর দিন দুর্গম পথ অতিক্রম করে বিশেষ করে অবিভক্ত সিয়াং জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মপ্রচারের কাজ চালিয়ে গিয়েছেন তিনি। এই যাত্রা কোনও আরামদায়ক মিশনারি সফর ছিল না; বরং প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল শারীরিক পরিশ্রম, অনিশ্চয়তা, সাহস এবং ঈশ্বরের প্রতি অটল নির্ভরতা। দীর্ঘ এই প্রচারক জীবনে তাঁর মাধ্যমে প্রায় ২,৫০০ জন মানুষ বাপ্তিস্ম গ্রহণ করেন। এই বিপুল সংখ্যার মধ্যে রয়েছেন এমন অনেক মানুষ, যাঁরা পরবর্তীকালে মন্ত্রী, সরকারি আধিকারিক, অরুণাচল প্রদেশ সরকারের কমিশনার, বিভিন্ন কাউন্সিলের সভাপতি, যাজক ও রেভারেন্ড হিসেবে সমাজ এবং চার্চের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ইতিমধ্যেই পরলোকগমন করেছেন, আবার অনেকে আজও নিজ নিজ ক্ষেত্রে মানুষের সেবা করে চলেছেন। তাঁদের জীবন ও কর্মের মধ্য দিয়েও মারবম তাসারের দীর্ঘদিনের ধর্মপ্রচারের প্রভাব প্রতিফলিত হচ্ছে।

ধর্মপ্রচারের পাশাপাশি চার্চের সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত আদি ব্যাপটিস্ট বানে কেবার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৯২ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত গালো ব্যাপটিস্ট চার্চ কাউন্সিলের সহ-সভাপতির দায়িত্বও সামলান। তাঁর দীর্ঘ ধর্মীয় জীবনে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হয়। ১৯৯০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিওলে অনুষ্ঠিত ব্যাপটিস্ট ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্সের ১৬তম সাধারণ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৯৬ সালে পবিত্র ভূমি ইজরায়েল সফর করেন এবং বাইবেলের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শনের সুযোগ পান। দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ধর্মতাত্ত্বিক জ্ঞান ও নেতৃত্বের দক্ষতা আরও সমৃদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ১৯৯৮ সালে ফুতসেরো থিওলজিক্যাল কলেজে তিন মাসের নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতেও অংশগ্রহণ করেন। তাঁর দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা, অভিজ্ঞতা ও চার্চের প্রতি অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৮ সালের ২৪ মে গালো ব্যাপটিস্ট চার্চ কাউন্সিলের পক্ষ থেকে তাঁকে রেভারেন্ড পদে অভিষিক্ত করা হয়। অভিষেকের তারিখ অনুযায়ী তিনি তাঁর কাউন্সিলের প্রথম অভিষিক্ত ব্যক্তি হিসেবে ঐতিহাসিক স্বীকৃতি অর্জন করেন। এই সম্মানকে তিনি কখনও ব্যক্তিগত মর্যাদা বা পদমর্যাদা হিসেবে দেখেননি; বরং ঈশ্বর ও চার্চের প্রতি আরও গভীর দায়িত্ব পালনের সুযোগ হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন।

মারবম তাসারের দীর্ঘ কর্মজীবনের নেপথ্যে তাঁর পরিবারের অবদানও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী লবির সহযোগিতা, ভালোবাসা, প্রার্থনা ও মানসিক সমর্থন তাঁকে প্রতিটি প্রতিকূল সময়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। পিতৃহীন শৈশব, ধর্মপ্রচারের কারণে নিগ্রহ, ব্যবসা ও জীবিকার উৎস ত্যাগ, সন্তান হারানোর বেদনা এবং দুর্গম পথে বছরের পর বছর ভ্রমণ—জীবনের প্রতিটি কঠিন অধ্যায়ে পরিবার ও খ্রিস্টীয় সমাজের সহযোগিতা তাঁর শক্তি হয়ে উঠেছিল। নিজের দীর্ঘ কর্মজীবন ও অবদানের কথা বলতে গিয়ে তিনি কখনও ব্যক্তিগত কৃতিত্বের দাবি করেননি। বরং ঈশ্বরের অনুগ্রহ, চার্চের সদস্যদের প্রার্থনা এবং খ্রিস্টীয় সমাজের সহযোগিতাকেই নিজের জীবনের প্রধান প্রাপ্তি হিসেবে স্বীকার করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, মানুষের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ঈশ্বরের কৃপা ও নির্দেশনায় অসাধ্য কাজও সম্পন্ন করা সম্ভব।

দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে সুসমাচার প্রচার, চার্চ প্রতিষ্ঠা, নেতৃত্ব প্রদান এবং মানুষের আধ্যাত্মিক বিকাশে অবদান রাখার পর এবার সক্রিয় চার্চ মন্ত্রণালয় থেকে অবসর গ্রহণের এক বিশেষ পর্যায়ে পৌঁছেছেন রেভারেন্ড মারবম তাসার। তবে তাঁর অবসর মানেই তাঁর কর্মজীবনের অবসান নয়। বরং তাঁর দীর্ঘদিনের আত্মত্যাগ, বিশ্বাস ও কর্মযজ্ঞ আগামী প্রজন্মের কাছে এক মূল্যবান উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে। প্রায় ২,৫০০ জনকে বাপ্তিস্ম প্রদান, বিভিন্ন অঞ্চলে খ্রিস্টীয় মণ্ডলী গড়ে তোলা এবং বহু মানুষকে ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বের পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করা তাঁর জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অবদান। তাঁর জীবন আজও স্মরণ করিয়ে দেয়, ঈশ্বরের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে হলে প্রয়োজন অটুট বিশ্বাস, সাহস, ধৈর্য, আত্মত্যাগ এবং মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করা এক সাধারণ যুবকের ঈশ্বরের বাণী প্রচারের জন্য নিজের জীবিকা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার এই কাহিনি নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার।

রেভারেন্ড মারবম তাসারের জীবন কেবল একজন ধর্মীয় নেতার জীবনী নয়; এটি একজন মানুষের বিশ্বাসে রূপান্তরিত হওয়া, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং নিজের জীবনকে একটি মহান উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার ইতিহাস। তাঁর দীর্ঘদিনের প্রচারক জীবন, চার্চের প্রতি নিষ্ঠা এবং অসংখ্য মানুষের জীবনে রেখে যাওয়া প্রভাব অরুণাচল প্রদেশের খ্রিস্টীয় সমাজে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর এই আত্মনিবেদিত জীবন আগামী প্রজন্মের প্রচারক, ধর্মীয় শিক্ষার্থী এবং খ্রিস্টীয় সমাজের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠুক। জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে যিনি ঈশ্বরের ওপর নির্ভর করেছেন, তাঁর আগামী দিনগুলিও সুস্বাস্থ্য, শান্তি ও ঈশ্বরের আশীর্বাদে পরিপূর্ণ হোক—এই কামনাই সকলের। সমস্ত গৌরব, সম্মান ও প্রশংসা সেই ঈশ্বরেরই প্রাপ্য, যিনি তাঁকে আহ্বান করেছেন, শক্তি জুগিয়েছেন এবং তাঁর জীবনকে নিজের মহিমার কাজে ব্যবহার করেছেন।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*