সুব্রত দাস, গন্ডাছড়া, ০৩ জুলাই || ধলাই জেলার গণ্ডাছড়া মহকুমার নারিকেল কুঞ্জে কৃষি দপ্তরের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হলো রাজ্যভিত্তিক আম উৎসব। উৎসবের শুভ উদ্বোধন করেন রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী রতনলাল নাথ। অনুষ্ঠানে রাজ্যের আম চাষের প্রসার, কৃষকদের আয় বৃদ্ধি এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ঘোষণা দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নন্দিতা দেববর্মা রিয়াং, প্রমোদ রিয়াং, এমডিসি ক্ষত্রজয় রিয়াং, কৃষি দপ্তরের অধিকর্তা ড. ফণীভূষণ জামাতিয়া, প্রাক্তন সাংসদ রেবতী ত্রিপুরা, প্রাক্তন এমডিসি ভূমিকা নন্দ রিয়াং, মহকুমা শাসক অভিজিৎ সিং যাদব (আইএএস), শান্তি কিশোর চাকমাসহ বিভিন্ন দপ্তরের আধিকারিক ও জনপ্রতিনিধিরা।
উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কৃষিমন্ত্রী রতনলাল নাথ বলেন, বিশ্বের সর্বোচ্চ আম উৎপাদনকারী দেশ ভারত। ত্রিপুরার উৎপাদিত আমের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বৈচিত্র্য, যা দেশের অন্য কোনো রাজ্যে এতটা দেখা যায় না। বর্তমানে রাজ্যে প্রতি হেক্টরে গড়ে ৫ থেকে ৫.৫ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হলেও গণ্ডাছড়া ও গণ্ডাতুইসা এলাকায় প্রতি হেক্টরে প্রায় ৯ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হচ্ছে, যা রাজ্যের কৃষকদের সাফল্যের পরিচায়ক।
তিনি জানান, রাজ্যজুড়ে আম চাষ সম্প্রসারণে সরকার একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। গণ্ডাতুইসা এলাকায় নতুন করে ৩৪২ কানি জমিতে আম চাষের আওতা বৃদ্ধি করা হবে। পাশাপাশি পুরনো আমবাগান সংস্কারের জন্য আর্থিক সহায়তা, বিনামূল্যে কৃষিযন্ত্র ও ড্রিপ ইরিগেশন সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। আম সংরক্ষণের জন্য একটি সোলার কুল চেম্বার ইতোমধ্যে নির্মিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও পাঁচটি কুল চেম্বার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু কৃষির উন্নয়ন নয়, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি পর্যটনেরও বিকাশ ঘটানো। আমের পাশাপাশি পাম অয়েল, আদা ও হলুদের চাষে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের আয় বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার কাজ করছে। তাঁর দাবি, আগে কৃষকদের গড় মাসিক আয় ছিল প্রায় ৬ হাজার টাকা, যা বর্তমানে বেড়ে ১৩ হাজার টাকারও বেশি হয়েছে।
রাজ্যের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজ্যের মোট আয়ের প্রায় ৪৮ শতাংশ আসে কৃষিখাত থেকে। পর্যটন, ব্যবসা ও পরিবহন খাতের অবদান ৪৩ শতাংশ এবং শিল্পখাতের অবদান ৯ শতাংশ। তাই কৃষিকে আরও লাভজনক ও আধুনিক করে তুলতে সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে রাজ্যের চারটি জেলা খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ধলাই জেলাকেও সেই পর্যায়ে নিয়ে যেতে ১৫ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কৃষক ও বিভিন্ন সংগঠনের সহযোগিতায় এই লক্ষ্য অর্জনে কাজ চলছে।
তিনি আরও জানান, কৃষকদের স্বার্থে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন কমাতে কভার কন্ডাক্টর স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ‘মাইক্রোগ্রিড’ প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। গণ্ডাছড়া সংলগ্ন এলাকায় ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যেখানে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন পৃথকীকরণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতে পারে বলে জানান তিনি।
এদিকে, রাজ্যভিত্তিক আম উৎসবকে ঘিরে দিনভর ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। বিভিন্ন প্রজাতির আমের প্রদর্শনী, কৃষকদের অংশগ্রহণ এবং দর্শনার্থীদের ভিড়ে উৎসব প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
তবে উৎসবকে কেন্দ্র করে একটি অপ্রীতিকর ঘটনাও সামনে আসে। অভিযোগ, অনুষ্ঠানস্থলে সংবাদ সংগ্রহে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের বহনকারী একটি গাড়ি লক্ষ্য করে দুই অজ্ঞাতপরিচয় যুবক হামলার চেষ্টা চালায়। যদিও অভিযুক্তদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার পর সাংবাদিকরা বিষয়টি মৌখিকভাবে মহকুমা পুলিশ আধিকারিকের নজরে আনেন। সাংবাদিকদের দাবি, সংবাদ সংগ্রহে যাওয়ার পথেই এ ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সাংবাদিক, সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
