গোপাল সিং, খোয়াই, ১৮ জানুয়ারি || ২০০২ সালের ১৩ই জানুয়ারি খোয়াইয়ের সিঙ্গিছড়া ২ নম্বর প্যাক্স বাজারে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের স্মৃতিতে আজ ১৮ই জানুয়ারি শহীদ সমাবেশের আয়োজন করল বিজেপি খোয়াই মন্ডল কমিটি। উল্লেখ্য, ওইদিন নিরাপত্তাবাহিনীর বেশে এনএলএফটি’র বৈরীরা নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ১৬ জন নিরীহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। নিহতরা হলেন, মনিন্দ্র নন্দী, নগেন্দ্র পাল, নিতাই কানু,আবু নাথশর্মা, বলাই কানু, সোমা নাথশর্মা, তমাল গোস্বামী, অরবিন্দু গোস্বামী (বাবুল), পরিতোষ দাস, মেঘ সবর, বাবুল নন্দী, রেনু খদাল দাস, সপ্না খদাল দাস, বিনোদ পাল, মালতী পাল, মন্টু পাল।
২০০২ সালের সেই ভয়াবহ ঘটনার স্মরণে আয়োজিত এই সমাবেশে আবেগ, প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক বার্তা—সবই উঠে আসে বক্তাদের বক্তব্যে। প্রথমেই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। নীরবতা পালন করা হয়। শহীদদের পরিবার-পরিজনরাও এদিন উপস্থিত ছিলেন সমাবেশে। বিজেপি রাজ্য সভাপতি তথা সাংসদ রাজীব ভট্টাচার্য্য প্রথমেই শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং শহীদ পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। মত বিনিময় করেন ভারাক্রান্ত শহীদ পরিবারের সদস্যদের সাথে এবং স্মারক ও বস্ত্র তুলে দেন। বিজেপি অন্যান্য নেতৃত্বরাও শহীদ পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে স্মারক ও বস্ত্র তুলে দেন।
সমাবেশের প্রধান বক্তা ছিলেন বিজেপি ত্রিপুরা প্রদেশের সভাপতি ও রাজ্যসভার সাংসদ রাজীব ভট্টাচার্য্য। তিনি তাঁর বক্তব্যে অভিযোগ করেন, সিপিআই(এম) আশ্রিত দুষ্কৃতীরাই মানুষের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করতে এই ধরনের নৃশংস ঘটনার পেছনে মদত জুগিয়েছিল। তাঁর কথায়, বামেদের রাজনীতির মূল হাতিয়ার ছিল ভয় দেখানো। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল যে শেষ কথা বলে জনগণই। জনগণই শেষ পর্যন্ত বামেদের ক্ষমতাচ্যুত করেছে এবং আতঙ্কের রাজনীতি থেকে মুক্তি পেয়েছে। খুন, সন্ত্রাস করে খোয়াই জেলাকে বামেদের গড় তৈরী করা হয়েছিল। বিরোধী দল করলেই নৃশংস হত্যা কান্ড সংগঠিত করা হতো। মান্দাইয়ে গণহত্যার আগাম খবর থাকলেও বাম সরকার কর্ণপাত করেনি। আজও এই ঘটনার বিচার পায়নি কেউ। মৃত্যুর পূর্বে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নৃপেন চক্রবর্তী বলেছিলেন, তখনকার সময়ে কমিউনিষ্ট পার্টি থেকেড দুর্গন্ধ বেরুচ্ছে। এর জন্য তাকে বহিস্কৃত করা হয়।
কল্যাণপুর–প্রমোদনগর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক পিণাকী দাস চৌধুরী বলেন, শহিদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করেই দেশ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য। তিনি খোয়াইয়ের বর্তমান সিপিআই(এম) বিধায়কের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, কমিউনিস্ট পার্টির ভূষণ কি —মিথ্যাচার, শাসন কি — অত্যাচার, নীতি কি —শোষন, আদর্শ কি — দালালি। তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, কমিউনিস্ট সন্ত্রাস ছাড়া থাকতে পারেনা, রক্ত শোষণ ছাড়া থাকতে পারেনা, খুন ছাড়া থাকতে পারেনা। তাই ২০২৮ এ তিনি কমিউনিস্ট মুক্ত খোয়াইয়ের ডাক দেন।
বিজেপি খোয়াই জেলা সভাপতি বিনয় দেববর্মা বলেন, শুধু এই গণহত্যা নয়, খোয়াই জেলায় বাম জমানায় বহু গণহত্যা সংগঠিত হয়েছে। নতুন প্রজন্মকে এগুলো জানতে হবে।
বিজেপি খোয়াই মন্ডল সভাপতি অনুকুল দাস বলেন, ভুলিনি, ভুলবো না—রক্তে লেখা ইতিহাস কখনও মুছে যায় না। ইতিহাস সাক্ষী, ২০০২ সালের ১৩ই জানুয়ারি শাসনের নীরবতায় সিঙ্গিছড়া ২ নম্বর বাজারে যে ঘটনা ঘটেছিল, তা আজও মানুষের মনে দগদগে ক্ষত হয়ে রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সন্ত্রাস নয় সংবিধান, বন্দুক নয় গণতন্ত্র—এই আদর্শ নিয়েই ভারতীয় জনতা পার্টি এগিয়ে চলেছে।
বিজেপি খোয়াই জেলা সাধারণ সম্পাদক সমীর দাসও একই সুরে বলেন, রক্তে লেখা ইতিহাস কখনও মুছে যায় না। ২০০২ সালের সেই নৃশংস ঘটনার সাক্ষী আজও ইতিহাস। গণতন্ত্র ও সংবিধানের পথেই বিজেপি রাজনীতি করে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
শহীদ সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন খোয়াই জেলা সভাপতি বিনয় দেববর্মা, বিধায়ক পিণাকী দাস চৌধুরী, খোয়াই মন্ডল সভাপতি অনুকুল দাস, জেলা সাধারণ সম্পাদক সমীর দাস, খোয়াই জিলা পরিষদের সভাধিপতি অপর্ণা সিংহরায়, খোয়াই পুর পরিষদের চেয়ারপার্সন দেবাশীষ নাথশর্মা সহ খোয়াই জেলা ও মন্ডলের একাধিক কার্যকর্তা ও নেতা-কর্মীরা। সমাবেশ জুড়ে শহিদদের স্মরণে শোক, শ্রদ্ধা ও রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞার আবহ স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।
