শিক্ষা দপ্তরের অচলাবস্থা চরমে, পাঠ্যবই নেই, সিলেবাসে গড়মিল, ক্ষুব্ধ অভিভাবক মহল

গোপাল সিং, খোয়াই, ০১ জুন || শিক্ষা দপ্তরের নিত্যদিনের গাফিলতি এখন আর নতুন কোনো খবর নয়। অভিভাবকদের অভিযোগ, রাজ্যের সরকারী স্কুলগুলোতে পঠন-পাঠনের যে হাল ফুটে উঠছে তার সাথে পাল্লা দিয়ে রাজ্য শিক্ষা দপ্তরের তুঘলকিপণাও বেড়েই চলছে। বিশেষ করে খোয়াই মহকুমার বনেদী স্কুলগুলোতে পঠন-পাঠনের অবস্থা তথৈবচ। প্রয়োজনীয় শিক্ষককের অনুপাত যেমন নেই, তেমনি বিদ্যালয়ে সমায়নুবর্তিতা ও নিয়মানুবর্তিতারও অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। খোয়াইয়ের সিবিএসই পরিচালিত বিদ্যাজ্যোতি স্কুলগুলোর পাশাপাশি বাংলা মিডিয়ামের অবস্থার কোনো ফারাক নেই। অথচ ভর্তির ফি দিয়েও চলতি শিক্ষাবর্ষে ইংলিশ মিডিয়াম (বিদ্যাজ্যোতি) স্কুলগুলোর বহু ছাত্র-ছাত্রীর ভাগ্যে জুটেনি পাঠ্যবই। অভিভাবকদের অভিযোগ, কোনো কোনো স্কুলে তো সিলেবাসও দেওয়া হয়না। পরীক্ষার পূর্বে যা পড়ানো হয় তাই নাকি সিলেবাস! এবছর তো আরও বাড়াবাড়ি হয়ে গেল। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের সিলেবাস নিয়ে রীতিমতো রসিকতার শিকার ছাত্র-ছাত্রীরা। অভিভাবকদের আরও অভিযোগ, গ্রীষ্মের ছুটির আগে স্কুল থেকে দেওয়া সিলেবাসের সাথে এসসিআইরটি প্রদত্ত সিলেবাসে রয়েছে বহু অসামঞ্জস্যতা। স্বভাবতই বিপাকে ছাত্র-ছাত্রীরা। উপরন্তু এসসিইআরটি তাদের নিজস্ব সাইটে আপলোড করলো ভুলে ভরা চলতি শিক্ষাবর্ষের সিলেবাস। স্বভাবতই বলা যায়, ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’-র যুগেও রাজ্যের শিক্ষা দপ্তরের আধিকারিকরা মুখ্যমন্ত্রী তথা শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ মানিক সাহার ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে উঠে-পড়ে লেগেছেন। এমনটাই অভিযোগ অভিভাবক ও বিশ্লেষকদের একাংশের।
চলতি শিক্ষাবর্ষে খোয়াই মহকুমার বিদ্যাজ্যোতি প্রকল্পভুক্ত সিবিএসই ইংরেজি মাধ্যম সহ বাংলা মাধ্যমের সরকারী স্কুলগুলোতে এখনো সব পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি। শুধু তাই নয়, অনেক স্কুল এখনও পর্যাপ্ত সিলেবাস পর্যন্ত বিতরণ করতে পারেনি। কিছু স্কুল গত বছরের সিলেবাস তুলে দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে চাইলেও সম্প্রতি এসসিআরটি-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নতুন সিলেবাসের সঙ্গে তার গরমিল ধরা পড়ায় স্কুল কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। গত ৩০শে মে এসসিআরটি-এর অফিসিয়াল সাইটে আপলোড হওয়া নতুন সিলেবাসে দেখা গেছে, শুধুমাত্র ৩য় ও ৬ষ্ঠ শ্রেণির ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের সিলেবাস আপলোড হয়েছে, অন্য শ্রেণিগুলোর ক্ষেত্রে পুরোনো ২০২৪-২৫ সিলেবাসই বহাল রয়েছে। এমনকি ককবরক ভাষার সিলেবাসেও আপডেটের কোনো ছাপ নেই। স্কুল বন্ধ হওয়ার পর গ্রীষ্মের ছুটিতে শিক্ষার্থীদের হাতে সঠিক সিলেবাস না পৌঁছানোয় অভিভাবকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। আগামী মাসে স্কুল খোলার পরপরই ‘পিরিয়ডিক টেস্ট-১’ থাকায় সময় খুবই সীমিত। নতুন ও পুরাতন সিলেবাসের ফারাক শিক্ষার্থীদের চরম চাপে ফেলেছে। এছাড়া অভিভাবকদের আরও অভিযোগ, খোয়াইয়ের বনেদী স্কুলগুলোতে শিক্ষক স্বল্পতা দূরীকরণে শিক্ষা দপ্তরের কোনো প্রচেষ্টা নেই। অথচ বিভিন্ন স্কুলগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সময় মতো স্কুলে প্রবেশ করার প্রবণতা হ্রাস পাচ্ছে। যেখানে সরকারী নিয়মে মাসে ২টি ক্যাজুয়েল লিভই রয়েছে সেখানে একের পর এক শিক্ষক-শিক্ষিকা দীর্ঘদিন অনৈতিকভাবে ছুটি ভোগ করছেন বলেও অভিভাবকদের একাংশ অভিযোগ করছেন। যার ফলে নিয়মিত স্কুলে পঠন-পাঠন হচ্ছেনা খোয়াই শহর ও শহরতলীর অনেক স্কুলেই। বহু দূর-দূরান্ত থেকে অভিভাবকরা অটো বা টমটম করে নিজ সন্তানকে একটু ভাল শিক্ষা গ্রহনের জন্য নিয়ে আসলেও, স্কুলগুলোর পরিষেবা দেখে প্রচন্ড হতাশ হতে হচ্ছে তাদের। তার মধ্যে শিক্ষা দপ্তরের দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজের খেশারত দিতে হচ্ছে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের। গোটা বিষয়কে ঘিরে অভিভাকদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
যদিও শুধু বই ও সিলেবাস নয়, রাজ্যের শিক্ষা দপ্তর শিক্ষক সংকট দূরীকরণেও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। টেট পরীক্ষার মাধ্যমে সমস্যা মেটানো যায়নি, ফলে বিদ্যালয়গুলোর কার্যকারিতা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এরই মধ্যে ২০২১ সালে ১০,৩২৩ জন শিক্ষকের একসঙ্গে চাকরিচ্যুতির ঘটনা শিক্ষা ব্যবস্থার উপর বিশাল প্রভাব ফেলেছে, যার রেশ এখনও কাটেনি। চাকরিচ্যুত শিক্ষকদের মতে, সুপ্রিম কোর্টে আরটিআই করে তারা জানতে পেরেছেন, তাদের চাকরি বাতিল হয়নি। এমনকি যে রিক্রুটমেন্ট পলিসি বাতিল করা হয়েছিল, সেই পলিসির ভিত্তিতেই তাদের নিয়োগই হয়নি বলে দাবি তাদের। তারা মনে করেন, মুখ্যমন্ত্রী এবং শিক্ষা দপ্তরের সদিচ্ছা থাকলে তাদের পুনর্বহাল করা সম্ভব। একজন শিক্ষকের মতে, এই ঘটনা যদি আসাম প্রদেশে ঘটতো তবে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মা হয়তো কবেই এই এত বড়ো অংশের শিক্ষকদের পুনরায় শিক্ষা দপ্তরে ফিরিয়ে নিয়ে আসতেন। কারন শিক্ষা দপ্তর ধুঁকছে, অথচ রাজ্যের বড়ো একটা শিক্ষক সমাজ চাকুরীচ্যুত হয়ে ধুকে ধুকে মরছে তা এ রাজ্যের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষও হজম করতে পারছেন না। এখন পর্যন্ত চাকুরীচ্যুত শিক্ষকদের মধ্যে ২০০ জনের উপর প্রয়াত হয়েছেন। বেশ কিছু শিক্ষক টেট এবং জেআরবিটি পরীক্ষার মাধ্যমে অন্য পেশার চাকুরী পেয়েছেন। যা সংখ্যায় খুবই নগন্য। চাকরিচ্যুতদের অনেকেই আজও বিচারের আশায় হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ। জানা গেছে, আগামী ১৯ জুন ত্রিপুরা হাইকোর্টে এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলার শুনানি রয়েছে। তাদের দাবি, রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার চাকা সচল রাখতে হলে, অভিজ্ঞ এই শিক্ষক সমাজকে পুনরায় কাজে ফিরিয়ে আনাই হবে সময়োপযোগী কাজ।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*