ডিজিটাল যুগে ফিকে হচ্ছে থিয়েটারের নস্টালজিয়া, দর্শকশূন্য হলের খরা কাটিয়ে ‘উত্তরণ নাট্যাঙ্গন’-এর উদ্যোগে খোয়াইয়ে শুরু হলো তিনদিনব্যাপী ‘নাট্য মন্থন’

গোপল সিং, খোয়াই, ০৩ জুলাই || সংস্কৃতির শহর খোয়াইয়ে নাট্যচর্চা এবং নাট্যশিল্পীদের জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৩৭ সালে। একসময় হলের আসন পেতে দর্শকদের ঘাম ঝড়াতে হতো, আর ‘চন্দন সেনগুপ্ত স্মৃতি নাট্যোৎসব’ ছিল খোয়াইবাসীর অত্যন্ত আবেগের এক উৎসব। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই চেনা নস্টালজিয়া যেন অনেকটাই বিলীন। মোবাইলের তীব্র আসক্তি যেমন তরুণ প্রজন্মকে খেলার মাঠ থেকে দূরে সরিয়েছে, তেমনই টাউন হলে নাটক দেখার পুরোনো উন্মাদনাও আজ হারিয়েছে। খোয়াইয়ের বহু খ্যাতনামা নাট্য ব্যক্তিত্ব জাতীয় স্তরে সুনাম কুড়ালেও, কালক্রমে আজ অনেকেই খোয়াই-বিমুখ। যারা এখনও রয়েছেন, তাঁদের বয়স হয়েছে। আর যারা শত প্রতিকূলতার মধ্যেও থিয়েটারকে বুকে আগলে রেখেছেন, তাঁদেরই আন্তরিক উদ্যোগে আজ দর্শকশূন্য পুরাতন টাউন হলের ঐতিহ্যবাহী মঞ্চে পর্দা উঠল তিনদিনব্যাপী নাট্যোৎসব ‘নাট্য মন্থন’-এর। লালছড়ার ‘উত্তরণ নাট্যাঙ্গন’ নামক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংস্থার হাত ধরে এই উৎসবের শুভ সূচনা হলো। যদিও নাটক শুরু হওয়ার নির্ধারিত সময় সন্ধ্যা ৬টা থাকলেও, উদ্বোধনী পর্বের নানাবিধ আনুষ্ঠানিকতার জেরে প্রথম দিনের নাটক শুরু হতেই ঘড়ির কাঁটায় ৭টার উপর বেজে যায়। এদিকে আজ উৎসবের প্রথম দিনে খোয়াই পুরাতন টাউন হলে আয়োজিত আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী পর্বে মঞ্চ অলঙ্কৃত করেছিলেন খোয়াই পুর পরিষদের চেয়ারপার্সন দেবাশীষ নাথশর্ম্মা, বিশিষ্ট সমাজসেবী অভিজিৎ দত্ত ভৌমিক, বিনয় দেববর্মা, খোয়াই জিলা পরিষদের সদস্য অনুকুল দাস, খোয়াই পঞ্চায়েত সমিতির ভাইস চেয়ারম্যান উত্তম অধিকারী এবং প্রবীণ নাট্যকার গণেশ দেবরায় সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
উদ্বোধনী মঞ্চে আলোচনা করতে গিয়ে খোয়াই পুর পরিষদের চেয়ারপার্সন দেবাশীষ নাথশর্ম্মা বলেন, “আজকের এই ডিজিটাল যুগে হাতের মুঠোয় বিশ্ব বন্দি। বিনোদনের নানা উপাদান ঘরে ঘরে মজুত। তারপরও যখনই সময় পাই, আমি নাটক দেখি। একসময় এই টাউন হল কাঁপিয়ে বেড়াতেন এক একজন প্রতিভাশালী অভিনেতা ও নাট্যশিল্পীরা। মাঝে বেশ দীর্ঘ বছর যাবত খোয়াইতে নাটকের এই ধারা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে আশার কথা হলো, বিগত বছর থেকে পুনরায় নাট্য উৎসব শুরু হয়েছে।” এই ধারাকে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি আয়োজকদের ধারাবাহিক প্রয়াস জারি রাখার আহ্বান জানান।
তিনদিনব্যাপী এই নাট্যোৎসবে একাধিক প্রতিভাশালী সংস্থার নাটক মঞ্চস্থ হতে চলেছে। উৎসবের প্রথম দিন অর্থাৎ ৩রা জুলাই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে মঞ্চস্থ হয় উত্তরণ নাট্যাঙ্গন সংস্থার নাটক ‘নিরুদ্দেশের পথে’, যার রচনা ও নির্দেশনায় ছিলেন গণেশ দেবরায়। উৎসবের দ্বিতীয় দিন তথা ৪ঠা জুলাই মঞ্চস্থ হবে দুটি নাটক—প্রথমটি কালচারাল ক্যাম্পেইন প্রযোজিত ‘চড়ক’ (রচনা: বিশ্বজিৎ চৌধুরী, নির্দেশনা: অরুণ পাল) এবং দ্বিতীয়টি উদয়পুরের অভিমুখ সংস্থার নাটক ‘শিরুই লিলি’ (রচনা: শুভ্রত চক্রবর্তী, নির্দেশনা: অমরজিত সরকার)। উৎসবের শেষ দিন তথা ৫ই জুলাই নাট্যপ্রেমীদের জন্য থাকছে একগুচ্ছ নাটক। এই দিন মঞ্চস্থ হবে শুভম নাট্যচক্রের নাটক ‘আজও অঞ্জনারা’ (রচনা ও নির্দেশনা: শিবব্রত রায়), নাট্যসংসদ প্রযোজিত ‘জীবন যেখানে’ (রচনা: হীরেন্দ্র সিনহা, নির্দেশনা: অভীক প্রসাদ চক্রবর্তী), ধর্মনগরের ইচ্ছেডানা সংস্থার নাটক ‘শো ম্যান’ (রচনা ও নির্দেশনা: স্বরূপ ঘোষ শান) এবং সবশেষে শুভম নাট্যচক্রের আরেকটি পরিবেশনা ‘রাজপুত্রের অভিযান’ (রচনা ও নির্দেশনা: শিবব্রত রায়)।
দেশের গণ্ডী পেরিয়ে আজও খোয়াইয়ের নাটক সুনামের সাথে বিভিন্ন মঞ্চে অভিনীত হয়। কিন্তু খোদ খোয়াইয়ের বুকে আজ নাটক দেখতে ভিড় না জমা নিশ্চিতভাবেই সংস্কৃতিপ্রেমীদের ভাবিয়ে তুলছে। থিয়েটার বাঁচিয়ে রাখার এই সাহসী লড়াইয়ে শামিল প্রবীণ ও নবীন নাট্যকর্মীরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, ডিজিটাল বিনোদনের মোহ কাটিয়ে মানুষ আবার হলমুখী হবেন এবং এই ঐতিহ্যবাহী মঞ্চ আবার করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠবে।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*