গোপল সিং, খোয়াই, ১০ জুন || তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালে বিধায়িকা কল্যাণী রায় সাহার আকস্মিক পরিদর্শন এবং তাঁর ক্ষোভের মুখে পড়ে মহকুমা স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ রাজা জমাতিয়ার কান্নায় ভেঙে পড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবার রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন মোড় এল। সরকারি আধিকারিকের প্রতি জনপ্রতিনিধির আচরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার প্রশ্ন তুলে এবার সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ মানিক সাহার দ্বারস্থ হলেন টিটিএএডিসি-র স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদের সদস্য তথা তিপ্রামথা পার্টির মুখপাত্র ও এমডিসি রাজেশ্বর দেববর্মা। তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেন যে, তেলিয়ামুড়া হাসপাতালে বিধায়িকার পরিদর্শনের সময় মহকুমা স্বাস্থ্য আধিকারিকের সাথে যে ধরনের আচরণ করা হয়েছে, তা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বহু নাগরিক একে ‘কঠোর ও অন্যায্য’ বলে মনে করছেন, যা সরকারি আধিকারিকদের মনোবল ভেঙে দিতে পারে।
গত ৯ই জুন, ২০২৬ ইং তারিখে এমডিসি রাজেশ্বর দেববর্মা মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ মানিক সাহার কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি জমা দিয়েছেন। একই সাথে চিঠির অনুলিপি রাজ্যের মুখ্য সচিব, স্বাস্থ্য দপ্তরের সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিকর্তার কাছেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালের সামগ্রিক ঘটনা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি সরকারি অফিস পরিদর্শনে জনপ্রতিনিধিদের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘গাইডলাইন’ বা নির্দেশিকা জারির জোরালো দাবি জানিয়েছেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে এমডিসি রাজেশ্বর দেববর্মা দুটি প্রধান সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক নীতির কথা উল্লেখ করেছেন: একজন বিধায়ক হিসেবে সরকারি দফতর বা হাসপাতাল পরিদর্শন করা, পরিষেবা খতিয়ে দেখা এবং জনগণের পক্ষে কথা বলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, যা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। একজন সরকারি আধিকারিক তাঁর কাজের জন্য অবশ্যই দায়বদ্ধ। তবে একই সাথে, পদের মর্যাদা রক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে তাঁর সাথে সম্মানজনক ও ন্যায়সংগত আচরণ পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে, যা প্রশাসনিক পরিকাঠামোকে শক্তিশালী রাখে।
তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেন যে, তেলিয়ামুড়া হাসপাতালে বিধায়িকার পরিদর্শনের সময় মহকুমা স্বাস্থ্য আধিকারিকের সাথে যে ধরনের আচরণ করা হয়েছে, তা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বহু নাগরিক একে ‘কঠোর ও অন্যায্য’ বলে মনে করছেন, যা সরকারি আধিকারিকদের মনোবল ভেঙে দিতে পারে। ক্ষমতার অপব্যবহার এড়াতে তিনি পরিদর্শনের একটি সঠিক প্রশাসনিক পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন: প্রথমে অফিস বা হাসপাতাল পরিদর্শন করে প্রকৃত তথ্য ও সমস্যা যাচাই করা খুঁজে পাওয়া সমস্যা বা অসঙ্গতিগুলো লিখিতভাবে নথিবদ্ধ করা। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে ওই আধিকারিকের কাছ থেকে লিখিত স্পষ্টীকরণ বা জবাব চাওয়া। প্রয়োজনে সেই বিষয়টিকে রাজ্য সরকার বা বিধানসভার অধিবেশনে উত্থাপন করা।
রাজেশ্বর বাবু জানান, এই সঠিক নিয়ম মেনে চললে ব্যবস্থার কোনো ক্ষতি না করেই ত্রুটি সংশোধন সম্ভব। কিন্তু তা না হলে প্রশাসনিক পদক্ষেপটি ন্যায়ের বদলে ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে প্রতিভাত হয়, যা প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানে।
মুখ্যমন্ত্রীর কাছে এমডিসির প্রধান ৩টি প্রার্থনা হলো, তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালের সাম্প্রতিক অনভিপ্রেত ঘটনা এবং সেখানকার সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিষেবার বেহাল দশা নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হোক। হাসপাতাল এবং অন্যান্য সরকারি দফতরে বিধায়ক বা জনপ্রতিনিধিদের পরিদর্শনের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা জারি করা হোক, যাতে শিষ্টাচার, শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা বজায় রেখে জনঅভিযোগের সমাধান করা যায়। তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালের মানোন্নয়নে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত কর্মী, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং পর্যাপ্ত ওষুধপত্র সরবরাহ করা হোক।
চিঠির শেষাংশে এমডিসি রাজেশ্বর দেববর্মা জানিয়েছেন, তিনি ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ মানিক সাহার ন্যায়পরায়ণ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন। মুখ্যমন্ত্রীর একটি সঠিক ও শান্ত সিদ্ধান্তই কেবল রাজ্যে সরকারি আধিকারিক এবং চিকিৎসকদের মনোবল ফিরিয়ে আনতে পারে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বার্তা দেবে যে, ত্রিপুরায় দৃঢ়তা ও নিরপেক্ষতার সাথেই ন্যায়বিচার পরিচালিত হয়। এই চিঠির পর তেলিয়ামুড়া হাসপাতাল কাণ্ডকে কেন্দ্র করে রাজ্য প্রশাসনিক অলিন্দে ও রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
