গোপল সিং, খোয়াই, ২৪ জুন || ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া খোয়াইয়ে আবারো এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এলো। এবার কোনো সীমান্ত চৌকি বা কাঁটাতারের বেড়ার কাছে নয়, সরাসরি খোয়াই শহরের এক লোকাল হোটেল থেকে দুই শিশু ও এক নাবালিকা সহ মোট ৫ জন বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করা হলো। তবে সবচেয়ে বড় ও বিপজ্জনক বিষয় হলো, ধৃত এই অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে ভারতের অত্যন্ত গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র ‘বৈধ আধার কার্ড’। প্রশাসনকে কার্যত অন্ধ বানিয়ে খোয়াইয়ের সচেতন আমজনতার তৎপরতাতেই আজ এই বড়সড় সাফল্য মিলেছে। যদিও জনগণের প্রশ্ন মানব পাচারকারীদের সাথে যুক্ত তাদের জালে পুলিশ ও প্রশাসন কেন ব্যর্থ? পাচারকারী ও গোটা নেটওয়ার্ক বগলদাবা করতে পুলিশ ও বিএসএফ কেন ব্যর্থ, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন জনগণ।
এদিকে ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, খোয়াই শহরের সুপরিচিত শেরওয়ালি হোটেলে সন্দেহজনকভাবে কয়েকজন ব্যক্তি অবস্থান করছেন বলে স্থানীয় নাগরিকদের নজরে আসে। তাঁদের কথাবার্তা এবং নথিপত্র খতিয়ে দেখার পর যখন স্থানীয় সচেতন যুবকদের সন্দেহ গভীর হয়, তাঁরা সাথে সাথে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে হোটেল থেকে দুই শিশু ও তিন জন প্রাপ্তবয়স্ক ও নাবালিকাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। জেরার মুখে ধৃতরা স্বীকার করে যে তারা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের নাগরিক। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তারা ভারতের বাণিজ্য নগরী মুম্বাইতে অবৈধভাবে বসবাস করছিল এবং সেখানে নানারকম কাজকর্মে যুক্ত ছিল। তারা মুম্বাই থেকে ট্রেনযোগে ত্রিপুরায় আসে এবং খোয়াই সীমান্তকে ‘সেফ করিডোর’ হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশে নিজেদের বাড়িতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। খোয়াই সুভাষপার্ক পুলিশ ফাঁড়ির ওসি রঞ্জিত সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ধৃত ৫ বাংলাদেশি নাগরিক একই পরিবারের সদস্য এবং তারা বাংলাদেশের ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত গোসাইরহাট থানার শারিদপুর এলাকার বাসিন্দা। ধৃতরা হলো, আনোয়ার খান (৩৭), পিতা- মুকেশ খান।রাকিব খান (১৯), পিতা- আলাউদ্দিন খান, মিস চিন্তিয়া খান (১৪), পিতা- আনোয়ার খান (নাবালিকা), মিস লামিয়া খান (৮), পিতা- আনোয়ার খান (শিশু) এবং মিস তাইয়িবা খান (৬), পিতা- আনোয়ার খান (শিশু)।
ধৃতদের জেরা করার সময় তাদের কাছ থেকে বৈধ ভারতীয় আধার কার্ড উদ্ধার হওয়া মাত্রই চোখ কপালে উঠেছে তদন্তকারীদের। এই ঘটনাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন চিহ্ন খাড়া করে দিয়েছে—বাংলাদেশি নাগরিকদের হাতে ভারতের এই গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি কীভাবে এলো? ভারতের বুকে জাল নথিপত্র তৈরির কারখানা এবং আন্তর্জাতিক পাচার চক্র কতটা গভীরে নিজের শিকড় গেড়েছে, এই ঘটনা তারই এক অকাট্য প্রমাণ। খোয়াইয়ের সচেতন নাগরিকদের একাংশ ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলছেন, আজ যেভাবে সাধারণ শ্রমজীবী সেজে বাংলাদেশিরা আধার কার্ড বানিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ঠিক সেভাবেই হয়তো আন্তর্জাতিক স্তরের বহু কুখ্যাত অপরাধী, দাগী আসামী এবং জঙ্গিরাও জাল নথির সাহায্যে ভারতে নাগরিকত্ব নিয়ে বহাল তবিয়তে বসবাস করছে। অন্যদিকে, এই অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা ভুয়ো পরিচয়পত্র নিয়ে ভারতের শ্রম বাজারে ঢুকে পড়ার ফলে প্রকৃত ভারতীয় বেকার যুবকেরা কাজ হারিয়ে দিন দিন কর্মহীনতায় ধুঁকছেন। আজকের এই ঘটনাকে প্রশাসন, পুলিশ ও সীমান্ত রক্ষী বাহিনী-র চোখ খোলার জন্য আরও একটি ‘ওয়েকআপ কল’ বা সতর্কবার্তা বলে অভিহিত করেছেন বুদ্ধিজীবী মহল। অতীতে প্রশাসনের একাংশের ঢিলেঢালা মনোভাব এবং উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে ত্রিপুরাকে অনুপ্রবেশের অন্যতম করিডোর বানানো হয়েছিল। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে খোয়াই সীমান্তে বিএসএফের স্পীডবোট নামানো এবং পুলিশের কড়া নজরদারিতে সাফল্য আসছে, কিন্তু বিগত কয়েক দশকে যে বিপুল পরিমাণ অনুপ্রবেশ ঘটে গেছে, তার চরম খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ভারতীয়দেরই।
জনগণের জোরালো দাবি, তিনদিকে বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে ঘেরা ত্রিপুরা রাজ্যের প্রতিটি হোটেল, লজ, বহুতল আবাসন এবং বিশেষ করে রেলপথ ও স্টেশনগুলিতে ২৪ ঘণ্টা কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করা হোক। একই সাথে, ধৃত এই বাংলাদেশিদের ম্যারাথন জেরা করে ভারতের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা সেই সমস্ত দেশদ্রোহী ও দালালদের (যাদের সাধারণ মানুষ ‘মিরজাফর’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন) চিহ্নিত করা অত্যন্ত আবশ্যক, যারা টাকার বিনিময়ে এই সমস্ত বিদেশিদের ঘর ও জাল নথিপত্র পাইয়ে দিচ্ছে। এই দালাল চক্রকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে না পারলে খোয়াই তথা ত্রিপুরার নিরাপত্তা যে আগামী দিনে বড়সড় সংকটের মুখে পড়বে, তা এখন স্পষ্ট। ধৃতদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করে আদালতে তোলা হবে জানান পুলিশ আধিকারিক।
