গোপাল সিং, খোয়াই, ২০ অক্টোবর || সাহিত্য, ভাবাবেগ এবং জীবনের শত প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ ছাপিয়ে অবয়বহীন এক নির্মম সন্ধ্যায় ঝরে গেল এক উজ্জ্বল স্ফুলিঙ্গ। বাংলা সাহিত্য ও নাট্যাঙ্গনের চিরপরিচিত মুখ, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং বিশিষ্ট নাট্য নির্দেশক ইন্দুমাধব চক্রবর্তীর প্রয়াণ যেন এক চলচ্ছ্ববি থেকে হঠাৎ রিল কেটে যাওয়ার মতো অতর্কিত এবং হৃদয়বিদারক। মহাসপ্তমীর আলো ঝলমলে উৎসবমুখর সন্ধ্যায় ভুবনেশ্বরের এক পূজা প্যান্ডেলের সামনে ঘটা এক আকস্মিক সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে জখম হয়েছিলেন তিনি। এরপর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই শেষে গতকাল মাঝরাতে ভুবনেশ্বরের একটি হাসপাতালে চিরনিদ্রায় তলিয়ে যান তিনি। তাঁর এই আকস্মিক বিদায়ে ত্রিপুরার ও বাংলার সাহিত্য এবং নাট্যমহলে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
১৯৫৭ সালের ১৯শে জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করা ইন্দুমাধব চক্রবর্তী কেবল একটি শ্রেণিকক্ষের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। ৯০-এর দশকেও যিনি ছিলেন এক শান্ত স্বভাবের বাতিঘর। বাংলা পাঠ্যবইয়ের পাতাগুলোয় সাহিত্য আর নাটকের শৈলী ফুটিয়ে তুলতেন অবলীলায়। তাঁর উচ্চারণগুলোর মধ্যে যেন মিশে থাকত পাথরকুচির মতো অমোঘ দৃঢ়তা—সোজাসাপটা, নিখাদ ও স্বতঃস্ফূর্ত। প্রধান শিক্ষকের গুরুদায়িত্ব পালন শেষে তিনি ভুবনেশ্বরে মেয়ের সান্নিধ্যে অবসর জীবন কাটাচ্ছিলেন। সহধর্মিণী ছিলেন তাঁর জীবনের প্রতি মুহূর্তের ছায়ার মতো সঙ্গী।
তিনি কেবল নাট্যমঞ্চ বা বিদ্যালয়েই নয়, ত্রিপুরা সরকারের রাজ্য শিক্ষা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ পর্ষদ-এর বিভিন্ন শিক্ষা সংক্রান্ত নির্দেশিকা, শিক্ষণ সামগ্রী ও পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনা কমিটির অন্যতম মূল সদস্য হিসেবেও রেখে গেছেন অনন্য অবদান।
আজ ভুবনেশ্বর থেকে ত্রিপুরা—সবত্রই তাঁর বাতাসে কেবলই শূন্যতা। যে মানুষটি আজীবন নাটকের মঞ্চে আলো জ্বেলেছেন এবং পাঠ্যপুস্তকের পৃষ্ঠায় শিখিয়েছেন জীবনের পাঠ, সেই মানুষটিই মহাকালের এক নির্মম সন্ধ্যায় সড়ক দুর্ঘটনার আকস্মিক স্ফুলিঙ্গে হারিয়ে গেলেন চিরতরে। তাঁর প্রয়াণে রইল কেবল তাঁর সৃষ্টিশীলতা, আদর্শ আর ভালোবাসার অমলিন স্মৃতিচিহ্ন।
