সুব্রত দাস, গন্ডাছড়া, ২৭ জুলাই || ত্রিপুরার ধলাই জেলার গন্ডাছড়া মহকুমার রইস্যাবাড়ি সীমান্ত এলাকা বর্তমানে অবৈধ পাচার চক্রের অন্যতম ঘাঁটি হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরেই এই এলাকায় পাচারকারীদের অবাধ বিচরণ এবং অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠছে। প্রশাসনিক নির্দেশিকা ও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও পাচার কার্যকলাপ যে হারে চলছে, তাতে জনমনে গভীর উদ্বেগ এবং পুলিশের প্রতি আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, রইস্যাবাড়ি সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসছে ছাগল, সুপারি, রসুন, শুঁটকি মাছ এবং বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ওষুধ। অপরদিকে, ভারত থেকে বাংলাদেশে পাচার হচ্ছে পেঁয়াজ, চিনি, কাপড়, বার্মিজ সিগারেট, ব্রাউন সুগার, ইয়াবা ট্যাবলেটসহ নানান নেশাজাতীয় দ্রব্য। পাচারকারীরা অটো, বোলেরো ও পিকআপ ভ্যানের সাহায্যে রাতের আঁধারে এই কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, এই সবকিছুর পেছনে রয়েছে পুলিশের একাংশের সরাসরি যোগসাজশ। এলাকাবাসীদের অভিযোগ, কিছু আরক্ষা কর্মী এবং স্পেশাল পুলিশ অফিসার (এসপিও) পাচারকারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে অবৈধ বাণিজ্যকে নির্বিঘ্ন করে তুলেছে। এমনকি, জেলা সদর দপ্তরে উপঢৌকন হিসেবে পাঠানো হচ্ছে সর্পি কলা, শিং মাছ, আম এবং নগদ অর্থ – যার বিনিময়ে পাচার বাণিজ্য “মসৃণ”ভাবে চালানো সম্ভব হচ্ছে।
আরও বিস্ফোরক অভিযোগ, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের পুলিশ আটক করলেও ‘প্রণামীর’ বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তাদের কাছ থেকে জব্দ করা মোবাইল, কুলার, ফ্রিজ, ফ্যানের মতো সামগ্রী রইস্যাবাড়ি থানার কোয়ার্টারেই ব্যবহৃত হচ্ছে বলেও জানা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় জনতার মধ্যে চরম ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। তাদের বক্তব্য, যেখানে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার অবৈধ অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করেছে, সেখানে পুলিশের একাংশের দুর্নীতি গোটা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
কেন্দ্রীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এবং বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড (বিজিবি) নিয়মিত টহল ও যৌথ অভিযানে সীমান্ত সুরক্ষা বজায় রাখার চেষ্টা চালালেও পুলিশের যোগসাজশে পাচারকারীরা বিএসএফ-এর নজর এড়িয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ। বিএসএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কালে ২৬০১ জন বাংলাদেশি নাগরিককে অবৈধ অনুপ্রবেশের সময় আটক করা হয়েছে, যা সীমান্তে অবৈধ কার্যকলাপের ব্যাপকতা প্রমাণ করে।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাচারবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন এবং পুলিশের ভূমিকাও কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে। রইস্যাবাড়ি থানার বিভিন্ন অনিয়ম এবং পাচার সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ও অভিযোগ সংবাদমাধ্যমের হাতে এসেছে, যা পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত হবে।
সীমান্ত নিরাপত্তা এবং জনগণের আস্থা রক্ষার স্বার্থে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী কীভাবে এই গুরুতর অভিযোগগুলির মোকাবিলা করে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা রাজ্যবাসী।
