সাগর দেব, তেলিয়ামুড়া, ২৩ জুন || তেলিয়ামুড়ার হাওয়াইবাড়ি এলাকায় ১৭ বছরের এক তরুণী গৃহবধূ রাখি সাহার রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা শহরে। চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসা, নাকি পরিবারের অসচেতনতা—এই প্রশ্নের মাঝেই নিভে গেল এক তরতাজা প্রাণ। শোকে পাথর হয়ে গিয়েছেন মৃতার পরিবার। কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মৃতার মা।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে আগরতলার চিকিৎসক ডাঃ টি.কে সরকারের অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন রাখি সাহা। রক্ত পরীক্ষার পর চিকিৎসক জানান, রোগীর ফুসফুসে জল জমেছে। সোমবার দুপুরে রাখিকে তেলিয়ামুড়ার এক বেসরকারি চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসক জানান, বিশেষ যন্ত্রপাতির সাহায্যে ফুসফুস থেকে জল বের করা হবে। এই চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয় ৩,০০০ টাকা।
চিকিৎসার সময় সিরিঞ্জের মাধ্যমে তরুণীর ফুসফুস থেকে তরল বের করা হয়। তবে চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই রাখির শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। সঙ্গে সঙ্গেই তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডাঃ অনির্বাণ ভৌমিক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
খবর ছড়িয়ে পড়তেই শহরজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—এত জটিল চিকিৎসা কেন একটি অপ্রস্তুত চেম্বারে করা হল? কেন সরকারি হাসপাতালে রেফার করা হল না? অর্থের লোভেই কি রোগীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হল?
স্থানীয়দের অভিযোগ, ডাঃ টি.কে সরকার দীর্ঘদিন ধরে তেলিয়ামুড়ার ‘জনপ্রিয় মেডিকেল হল’-এ চিকিৎসা করে আসছেন। এর আগেও তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। বেসরকারি এই ধরনের চিকিৎসা কেন্দ্রের উপর প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছিল।
সোমবার সন্ধ্যায় খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন তেলিয়ামুড়ার বিধায়িকা কল্যাণী সাহা রায়। তিনি মেডিকেল হলের কর্ণধার সুজিত বণিকের সঙ্গে কথা বলেন এবং ঘটনার বিস্তারিত জানতে চান। পরে পুলিশ সুজিত বণিককে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বিধায়িকা কল্যাণী সাহা রায় বলেন, “এই ঘটনা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। যারা চিকিৎসা করেন তারা মানুষের কাছে ভগবানের মতো। কিন্তু তারা যদি গরিব-সরল মানুষদের সঙ্গে প্রতারণা করেন, তা কখনোই বরদাস্ত করা হবে না। প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নেবে।”
এ বিষয়ে তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডাঃ অনির্বাণ ভৌমিক বলেন, “রোগীকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। মৃত্যুর সঠিক কারণ ময়নাতদন্তের পরেই জানা যাবে।”
ফলত, এই ঘটনা ফের একবার বেসরকারি চিকিৎসা চেম্বারের নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্ধকার দিক সামনে আনল। কে নেবে এই মৃত্যুর দায়? চিকিৎসকের অবৈধ সিদ্ধান্ত, নাকি প্রশাসনের উদাসীনতা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে গোটা তেলিয়ামুড়া।
বর্তমানে মৃতদেহটি তেলিয়ামুড়া মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে। প্রশাসন ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে।
