কমনওয়েলথ গেমসে ত্রিপুরার গর্ব: জুডোতে ভারতের প্রথম পদক জিতে ইতিহাস গড়লেন বিলোনিয়ার অস্মিতা দে — একান্ত সাক্ষাৎকারে অস্মিতার মা মুন্না দে

বলরাম দেবনাথ, সাব্রুম, ০১ আগস্ট || চরম দারিদ্র্য, অদম্য সংগ্রাম এবং অসীম অধ্যবসায়কে সঙ্গী করে বিশ্বমঞ্চে ইতিহাস গড়লেন ত্রিপুরার বিলোনিয়ার কন্যা অস্মিতা দে। কমনওয়েলথ গেমসের ৪৮ কেজি জুডো বিভাগে ভারতের হয়ে প্রথম পদক জিতে গোটা দেশকে গর্বিত করেছেন তিনি। দক্ষিণ ত্রিপুরার বিলোনিয়ার দক্ষিণ সোনাইছড়ি গ্রামের এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই ক্রীড়াবিদের সাফল্য আজ রাজ্যের ক্রীড়া ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
অস্মিতার সাফল্যের পথ মোটেও সহজ ছিল না। পরিবারের আর্থিক অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। তাঁর বাবা অর্জুন দে দক্ষিণ সোনাইছড়ি বাজারে একটি ছোট সাইকেল মেরামতির দোকান চালিয়ে সংসার সামলাতেন। মা মুন্না দে স্থানীয় একটি আয়ুর্বেদিক ডিসপেনসারিতে স্বল্প বেতনে কাজ করতেন। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও মেয়ের স্বপ্নকে কখনও থামতে দেননি তাঁরা।
ঋষ্যমুখ ব্লকের মধ্য সোনাইছড়ি স্কুলে প্রাথমিক পড়াশোনার সময় থেকেই জুডোর প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয় অস্মিতার। মেয়ের আগ্রহ বুঝে বাবা প্রতিদিন দক্ষিণ সোনাইছড়ি থেকে বিলোনিয়া বিদ্যাপীঠ স্কুল মাঠে প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে যেতেন। আর্থিক কষ্ট থাকলেও মেয়ের অনুশীলনে কোনোদিন ছেদ পড়তে দেননি তিনি।
পরবর্তীতে অস্মিতার প্রতিভা রাজ্য স্তরে স্বীকৃতি পায়। পানিসাগর হোস্টেলে প্রশিক্ষণের সুযোগ এলেও দূরত্বের কারণে সেখানে পাঠাতে পারেননি পরিবার। পরে নিজের যোগ্যতায় আগরতলার বাধারঘাট স্পোর্টিং স্কুলে ভর্তি হন অস্মিতা। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর পেশাদার ক্রীড়াজীবনের নতুন অধ্যায়, যার পরিণতি আজ কমনওয়েলথ গেমসের ঐতিহাসিক পদক।
অস্মিতার এই অসামান্য সাফল্যে আনন্দে ভাসছে তাঁর জন্মভূমি বিলোনিয়া। তবে এই আনন্দের মাঝেও রয়েছে গভীর বেদনার ছায়া। গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রয়াত হন তাঁর বাবা অর্জুন দে, যিনি ছিলেন অস্মিতার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
শনিবার বিলোনিয়ার কলেজ স্কোয়ারের বাড়িতে ‘নিউজ আপডেট অব ত্রিপুরা ডট কম’-এর প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অস্মিতার মা মুন্না দে ও বড় ভাই দেবব্রত দে।
দেবব্রত দে বলেন, “বাবা আজ বেঁচে থাকলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। অস্মিতার এই সাফল্যের পেছনে বাবার অবদানই সবচেয়ে বেশি। চরম অভাবের মধ্যেও বাবা বোনের স্বপ্নকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। আজ এই আনন্দের দিনে বাবাকে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে।”
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, কমনওয়েলথ গেমসে পদক জয়ের পর বাবার কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অস্মিতাও। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বাবার ত্যাগ ও অনুপ্রেরণাকেই নিজের শক্তি হিসেবে মনে করেন তিনি।
দারিদ্র্য কখনও স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারে না—নিজের জীবন দিয়েই সেই সত্য প্রমাণ করেছেন অস্মিতা দে। তাঁর এই ঐতিহাসিক সাফল্য শুধু ত্রিপুরার নয়, সমগ্র দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য এক অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*