আপডেট প্রতিনিধি, আগরতলা, ১৩ সেপ্টেম্বর || কৃষি উপকরণের ক্রমবর্ধমান ব্যয়, মাটির স্বাস্থ্যহানি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং কৃষির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে যখন উদ্বেগ বাড়ছে, তখন টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কৃষির বার্তা নিয়ে পশ্চিম ত্রিপুরার দামদামিয়ায় অনুষ্ঠিত হলো দুই দিনের আবাসিক প্রাকৃতিক কৃষি প্রশিক্ষণ।
যুব বিকাশ কেন্দ্র (YVK), কমলনয়ন জামনালাল বাজাজ ফাউন্ডেশন এবং বিশ্ব যুবক কেন্দ্র (VYK), নয়াদিল্লির যৌথ উদ্যোগে গত ১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। রাজ্যের আটটি জেলা থেকে মোট ১০০ জন প্রগতিশীল কৃষক এই প্রশিক্ষণে অংশ নেন।
“Learn • Practice • Adopt • Promote Sustainable Agriculture”—এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে আয়োজিত কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল কৃষকদের প্রাকৃতিক কৃষি সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধি এবং তাঁদের বাস্তবভিত্তিক, পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি-পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত করা। কৃষকদের নিজেদের জমিতে এসব পদ্ধতি প্রয়োগের পাশাপাশি সহকৃষকদের মধ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যও উৎসাহিত করা হয়।
প্রশিক্ষণের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মহারাষ্ট্রের ওয়ার্ধা থেকে আগত তিনজন অভিজ্ঞ রিসোর্স কৃষকের অংশগ্রহণ। তাঁরা প্রাকৃতিক কৃষিতে নিজেদের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং অংশগ্রহণকারী কৃষকদের বিভিন্ন ব্যবহারিক বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন। এর ফলে কৃষক-থেকে-কৃষক জ্ঞান বিনিময়ের একটি কার্যকর পরিবেশ তৈরি হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিম ত্রিপুরা জেলা পরিষদের সভাধিপতি বিশ্বজিৎ শীল, NABARD-এর ত্রিপুরা আঞ্চলিক কার্যালয়ের জেনারেল ম্যানেজার তনুশ্রী ভট্টাচার্য, কৃষি দপ্তরের যুগ্ম অধিকর্তা তথা ন্যাশনাল মিশন ফর ন্যাচারাল ফার্মিং-এর নোডাল অফিসার ড. উত্তম সাহা, যুব বিকাশ কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার তপন লোধ, কমলনয়ন জামনালাল বাজাজ ফাউন্ডেশনের সচিন জাদে এবং ASHA-র ডিরেক্টর ফাদার রবার্ট ইমানুয়েল ম্যাথিয়াস।
অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেন যুব বিকাশ কেন্দ্রের সভাপতি দেবাশিস মজুমদার। স্বাগত ভাষণ দেন সংগঠনের অর্গানাইজিং সেক্রেটারি পিঙ্কু দাস।
প্রশিক্ষণের বিভিন্ন কারিগরি অধিবেশনে প্রাকৃতিক কৃষি, টেকসই কৃষি-পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়। অধিবেশন পরিচালনা করেন বিভিন্ন দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কমলনয়ন জামনালাল বাজাজ ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি, KVK পশ্চিম ত্রিপুরার SMS ড. মন্দিরা চক্রবর্তী, ত্রিপুরা বায়োটেকনোলজি দপ্তরের যুগ্ম অধিকর্তা অঞ্জন সেনগুপ্ত, সহকারী কৃষি অধিকর্তা পিনাকী সরকার দে, BAPCL-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর সুদীপ মজুমদার, VHAT-এর মৃদুল পাল-সহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞ ও রিসোর্স পার্সন।
আলোচনা, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও ব্যবহারিক শিক্ষার মাধ্যমে কৃষকদের স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টেকসই কৃষি-পদ্ধতি গ্রহণের বিষয়ে উৎসাহিত করা হয়। পাশাপাশি নিজেদের অভিজ্ঞতা নথিভুক্ত করা এবং সফল উদ্যোগগুলি অন্যান্য কৃষকের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দুই দিনের প্রশিক্ষণ শেষে ১১ সেপ্টেম্বর সমাপনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন NABARD-এর ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার দিগন্ত কুমার দাস। উপস্থিত ছিলেন যুব বিকাশ কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার তপন লোধ। প্রশিক্ষণে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারী কৃষকদের হাতে শংসাপত্র তুলে দেওয়া হয়।
সমাপনী অনুষ্ঠানে আয়োজকদের পক্ষ থেকে কৃষকদের প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান নিজেদের কৃষিজমি এবং বৃহত্তর কৃষকসমাজের মধ্যে প্রয়োগ ও প্রসারের আহ্বান জানানো হয়। অংশগ্রহণকারী কৃষকরাও এই প্রশিক্ষণকে অত্যন্ত উপকারী বলে উল্লেখ করেন এবং রাজ্যের বাইরের অভিজ্ঞ কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি শেখার সুযোগকে মূল্যবান বলে জানান।
আয়োজকদের মতে, এই কর্মসূচি কেবল দুই দিনের একটি প্রশিক্ষণ নয়; বরং ত্রিপুরায় প্রাকৃতিক ও টেকসই কৃষির প্রসারে কৃষক-নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ। ভবিষ্যতে অংশগ্রহণকারী কৃষকরা নিজ নিজ জেলায় টেকসই কৃষি-পদ্ধতির ‘চ্যাম্পিয়ন’ হিসেবে কাজ করবেন এবং সহকৃষকদের উৎসাহিত করবেন—এমনটাই প্রত্যাশা আয়োজকদের।
প্রাকৃতিক কৃষির মাধ্যমে সুস্থ মাটি, পরিবেশের ভারসাম্য, জলবায়ু-সহনশীলতা এবং কৃষকদের টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। “শিখুন • অনুশীলন করুন • গ্রহণ করুন • টেকসই কৃষির প্রসার ঘটান”—এই বার্তাকেই সামনে রেখে ত্রিপুরায় আরও শক্তিশালী ও স্থিতিস্থাপক কৃষি ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
