ত্রিপুরা রাজ্যের বহুল চর্চিত ১০,৩২৩ শিক্ষক মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষ, রায়দান স্থগিত

গোপাল সিং, খোয়াই, ১৮ আগস্ট || ত্রিপুরার বহুল চর্চিত ১০,৩২৩ শিক্ষক ছাঁটাই মামলার চূড়ান্ত শুনানি আজ বিচারপতি সব্যসাচী দত্ত পুরকায়স্থের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চে সম্পন্ন হলো। আবেদনকারী স্নাতক শিক্ষক সুভাষ সিনহা, স্নাতক শিক্ষক শান্তনু ভট্টাচার্য এবং স্নাতকোত্তর শিক্ষক বিধান দাসের পক্ষে আইনজীবী অমৃত লাল সাহা, অভীক সাহা এবং টি.কে. নাইক তাদের চূড়ান্ত সওয়াল-জবাব পেশ করেন। সুপ্রিম কোর্ট থেকে ‘লিবার্টি’ বা মামলা করার অনুমতি পাওয়ার পরই আবেদনকারীরা এই মামলা দায়ের করেছিলেন।
অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের পক্ষে অ্যাডভোকেট জেনারেল শক্তিময় চক্রবর্তী এবং সরকারি আইনজীবী দীপঙ্কর শর্মা উপস্থিত থাকলেও মূলত দীপঙ্কর শর্মা সরকারের হয়ে যুক্তি উপস্থাপন করেন।
এদিন সকাল প্রায় ১১টা ২০ মিনিটে শুনানি শুরু হয়। আবেদনকারীদের পক্ষে আইনজীবী, বিশেষ করে অমৃত লাল সাহা, অত্যন্ত যুক্তি সহকারে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০১৭ সালের ২৩শে ডিসেম্বর ১০,৩২৩ শিক্ষকের পদমর্যাদা কমিয়ে অ্যাড-হক করা এবং ২০২০ সালের ৩১শে মার্চ গণছাঁটাইয়ের নির্দেশের জন্য সরকার যে ‘অ্যানেক্সার এ’ দাখিল করেছে, তাতে তন্ময় নাথ মামলায় হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারবিভাগীয় আদেশের উল্লেখ ছিল না। উপরন্তু, চাকরিচ্যুতির নোটিশ ব্যক্তিগতভাবে জারি করার নিয়ম থাকলেও এই আদেশগুলি ছিল গণহারে বা সার্বিকভাবে জারি করা। এছাড়াও, আইনজীবী সাহা আদালতে জানান, তন্ময় নাথ মামলায় সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার জন্য রাজ্য সরকারের আইন দপ্তরের অনুমোদনের যে চিঠি প্রয়োজন ছিল, তা ‘রুলস অফ এক্সিকিউটিভ বিজনেস (REB)’ অনুযায়ী দাখিল করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
আইনজীবী অমৃত লাল সাহা গণপরিষদের বিতর্ক এবং ডঃ বি. আর. আম্বেদকরের বক্তব্যের উল্লেখ করে বলেন, সংবিধানের ৩১১(২) ধারা অনুযায়ী কোনো কর্মচারীকে পূর্ব নোটিশ ছাড়া চাকরি থেকে বরখাস্ত করা যায় না এবং এই মামলার ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম প্রযোজ্য নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, তিনি তৎকালীন ত্রিপুরা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি দীপক কুমার গুপ্ত এবং বিচারপতি স্বপন চন্দ্র দাসের দেওয়া মূল রায়ের ১২৭ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে জোরের সঙ্গে বলেন, সেই রায়ে স্পষ্ট বলা ছিল যে তাঁদের আদেশ ‘ভবিষ্যৎ কার্যকর’ (prospective effect) হবে এবং শুধুমাত্র সেই ৬০-৬২ জন শিক্ষকের চাকরি বাতিল হবে, যাদের নিয়োগ নীতি নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।
অমৃত লাল সাহা আদালতে প্রমাণ করেন যে ১০,৩২৩ জন শিক্ষকের নিয়োগ হয়েছিল ১৯৭০ সালের নিয়োগবিধির ভিত্তিতে, যা ২০০১ এবং ২০০৭ সালে সামান্য সংশোধিত হয়েছিল এবং তাতে পাঁচ বছরের জন্য নির্দিষ্ট বেতনে নিয়োগের কথা বলা ছিল। তিনি যুক্তি দেন, সরকারের দাবি মতো ২০০৩ সালের কোনো অস্তিত্বহীন নীতির ভিত্তিতে এই নিয়োগ কখনোই হয়নি। তাই এই মামলাটি গোড়া থেকেই বাতিলযোগ্য বা ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’।
বিপরীতে, সরকারি পক্ষ তন্ময় নাথ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আদেশের ভিত্তিতেই যে ছাঁটাই করা হয়েছে, সেই অবস্থানের সমর্থনে কোনো জোরালো যুক্তি তুলে ধরতে পারেনি বলে জানা গেছে।
হাইকোর্ট সূত্রে খবর, বিচারপতি সব্যসাচী দত্ত পুরকায়স্থ অত্যন্ত ধৈর্য ধরে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন এবং মাঝে মাঝে সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও পর্যবেক্ষণের জন্য হস্তক্ষেপ করেন। এই মামলার চূড়ান্ত রায় পরবর্তী কোনো এক তারিখে ঘোষণা করা হবে, যা কজ লিস্টের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*