গোপল সিং, খোয়াই, ১৩ জুন || তেলিয়ামুড়া মহকুমায় কিছুতেই কাটছে না উদ্ধারকাজে প্রশাসনিক গাফিলতির কালিমালিপ্ত অধ্যায়। কিছুদিন আগেই তেলিয়ামুড়ায় এক ভয়াবহ ট্রাক দুর্ঘটনার পর টানা ৫ ঘণ্টা চাকার নিচে আটকে থেকে প্রশাসনের দিকে বেঁচে থাকার আকুতি নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন চালক মিহির দেবনাথ। কিন্তু সেবার উদ্ধারকাজে বিপর্যয় মোকাবিলা দলের একের পর এক আধুনিক গ্যাজেট ও অস্ত্র অকেজো হয়ে পড়ার নগ্ন রূপ দেখেছিল গোটা রাজ্যের মানুষ। শেষ পর্যন্ত মিহির দেবনাথের করুণ মৃত্যু হয়। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আজ, শনিবার সাতসকালে তেলিয়ামুড়ায় ফের একবার প্রশাসনিক উদাসীনতা ও বিপর্যয় মোকাবিলা দলের কাগুজে প্রস্তুতির নজিরবিহীন ব্যর্থতা সামনে এল। মাটি কাটার সময় আকস্মিক ধস নেমে পিকআপ ভ্যান চাপা পড়ে দুই জনজাতি যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এবং অপর একজন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন।
ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার ভোরে কৃষ্ণপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত চাকমাঘাট মুসলিম বস্তি এলাকায়। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কুঞ্জমুড়া এলাকার বাসিন্দা ২০ বছর বয়সী জেমস জমাতিয়া, ৩০ বছর বয়সী আশা হরি জমাতিয়া এবং একই এলাকার গাড়িচালক ৩০ বছর বয়সী অমূল্য ধন জমাতিয়া একটি পিকআপ ভ্যান নিয়ে নিজেদের বাড়ির কাজের জন্য মাটি সংগ্রহ করতে ওই এলাকায় যান। কিন্তু মাটি কাটার সময় আচমকাই উপর থেকে এক বিশাল মাটির স্তূপ ও ধস হুড়মুড়িয়ে তাঁদের ওপর ভেঙে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে মাটির নিচে চাপা পড়ে যান তিনজনই।
এই ভয়াবহ দৃশ্য চোখের সামনে দেখে এলাকার সাধারণ মানুষ দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। সরকারি সাহায্যের জন্য অপেক্ষা না করে স্থানীয়রাই প্রথমে নিজেদের উদ্যোগে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। এলাকাবাসীর চরম তৎপরতায় মাটির নিচ থেকে প্রথমে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় গাড়িচালক অমূল্য ধন জমাতিয়াকে। তাঁর পায়ে মারাত্মক চোট লাগে। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে তড়িঘড়ি তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যান, কিন্তু শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আগরতলার জিবি হাসপাতালে স্থানান্তর করেন।
এদিকে, এই খবর পেয়ে প্রথমে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায় অগ্নিনির্বাপক দপ্তরের কর্মীরা। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীদের তীব্র অভিযোগ, তেলিয়ামুড়া মহকুমা প্রশাসনের মূল বিপর্যয় মোকাবিলা দল ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে আরও প্রায় এক ঘণ্টা সময় পার করে দেয়। শুধু তাই নয়, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরও বিপর্যয় মোকাবিলা দলের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক এবং তা নিয়ে এলাকায় চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে, যেখানে দ্রুত মানুষকে বাঁচানোর তাগিদ থাকার কথা, সেখানে বিপর্যয় মোকাবিলা দলের সদস্যরা কার্যত হাত গুটিয়ে নির্বিকার দর্শকের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে, দমকল কর্মী এবং টিএসআর (TSR) দ্বাদশ বাহিনীর জওয়ানরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাটির নিচে কোদাল ও শাবল দিয়ে যুদ্ধকালীন তত্পরতায় উদ্ধারকাজ চালিয়ে যান।
পরবর্তীতে টিএসআর জওয়ান ও দমকল কর্মীদের যৌথ প্রচেষ্টায় মাটির গভীর থেকে জেমস জমাতিয়া ও আশা হরি জমাতিয়াকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় উদ্ধার করে তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুজনকেই মৃত বলে ঘোষণা করেন। এই ঘটনার পর হাসপাতালে পৌঁছায় তেলিয়ামুড়া থানার পুলিশ। পুলিশ মৃতদেহ দুটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায় এবং ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনার খবর পেয়ে বিপর্যয় মোকাবিলা দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিসিএম (DCM) জিনিয়াস দেববর্মা হাসপাতালে এসে মৃতদের পরিবারের সাথে কথা বললেও সংবাদমাধ্যমের তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে চাননি এবং কোনো প্রতিক্রিয়া না দিয়েই এড়িয়ে যান। অন্যদিকে, তেলিয়ামুড়া মহকুমা শাসক (SDM) অপূর্ব কৃষ্ণ চক্রবর্তী হাসপাতালে এসে প্রশাসনের পিঠ বাঁচাতে দাবি করেন, বিপর্যয় মোকাবিলা দলের সদস্যরা নাকি ভারী জেসিবি (JCB) মেশিনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু এসডিএম-এর এই দাবিকে ঘিরে ইতিমধ্যেই তীব্র বিতর্ক ও হাসির খোরাক তৈরি হয়েছে। কারণ, স্থানীয়দের বক্তব্য এবং ঘটনাস্থলের বাস্তব চিত্র অনুযায়ী, জেসিবি মেশিন ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর অনেক আগেই টিএসআর জওয়ান ও দমকল কর্মীরা নিজেদের শারীরিক পরিশ্রমে দুই যুবকের দেহ মাটির নিচ থেকে বের করে এনেছিলেন।
স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে—কয়েকদিন পর পরই কোটি কোটি টাকা খরচ করে যে বিপর্যয় মোকাবিলার ঘটা করে মকড্রিল বা মহড়া প্রদর্শন করা হয়, তা কি শুধুই প্রচারের আলো পাওয়ার জন্য? যেখানে প্রশিক্ষিত বিপর্যয় মোকাবিলা দলের সংকটময় মুহূর্তে উদ্ধারকাজের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা, সেখানে তারা কেন মাঠের মধ্যে নিষ্ক্রিয় ও পঙ্গু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো? চাকমাঘাটের এই মর্মান্তিক ঘটনায় দুটি তরতাজা প্রাণ অকালে ঝরে যাওয়ার পাশাপাশি তেলিয়ামুড়া মহকুমা প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা, সমন্বয়হীনতা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার নামে ঠুনকো ও কাগুজে প্রস্তুতির নগ্ন চিত্রটি আরও একবার রাজ্যবাসীর সামনে উন্মোচিত হলো।
