গোপল সিং, খোয়াই, ৩০ জুন || রাজধানী আগরতলার মহারাজা বীর বিক্রম বিমানবন্দর চত্বর থেকে গ্রেফতার হওয়া আটজন বাংলাদেশি নাগরিককে ঘিরে এবার সামনে এলো এক হাড়হিম করা ও বিস্ফোরক তথ্য। প্রাথমিক জেরায় ধৃতদের সাথে বাংলাদেশ ভিত্তিক কুখ্যাত নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাত-উল-মুজাহিদীন বাংলাদেশ বা ‘জেএমবি’র সরাসরি যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে তদন্তকারীরা। ওপার বাংলার এই জঙ্গি সংগঠনটি যে রাজধানী আগরতলা সহ ত্রিপুরার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকাকে নিজেদের ‘সেফ করিডোর’ হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই চাঞ্চল্যকর তথ্য আগেই ফাঁস করেছিল দেশের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা। এবার বিমানবন্দর পুলিশের জালে জেএমবি-র আট সক্রিয় সদস্য ধরা পড়ায় রাজ্য জুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে খবর, ধৃত এই জেএমবি জঙ্গিদের মূল পরিকল্পনা ছিল আগরতলা বিমানবন্দর থেকে বিমানে চড়ে কলকাতা হয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া এবং দেশের অভ্যন্তরে বড়সড় কোনো নাশকতা ঘটানো। কিন্তু ত্রিপুরার পুলিশ ও গোয়েন্দা দপ্তরের যৌথ তৎপরতায় তাদের সেই ভয়াবহ উদ্দেশ্য ভেস্তে যায়। উল্লেখ্য, গত কয়েক মাস আগেই আগরতলা শহরের জয়পুর এলাকা থেকে ‘জাগীর মিয়া’ নামে জেএমবি-র এক স্লিপার সেলের এজেন্টকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। এবার একযোগে আট জঙ্গির ধরা পড়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
মহারাজা বীর বিক্রম বিমানবন্দরে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৬ ও ২৭শে জুন দুই দফায় পৃথক অভিযান চালিয়ে এই আট বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী তথা জেএমবি সদস্যকে গ্রেফতার করে ত্রিপুরা পুলিশ। গত রবিবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর সুশান্ত দেব এই মেগা অভিযানের রুদ্ধশ্বাস বিবরণ তুলে ধরেছিলেন। তিনি জানয়েছিলেন যে, গ্রেফতারকৃত আটজনই পুরুষ। প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, এই ব্যক্তিরা প্রথম দফায় আসামের গুয়াহাটি যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। পুলিশ ধৃতদের কাছ থেকে একাধিক মোবাইল ফোন সহ বেশ কিছু ব্যক্তিগত জিনিসপত্র জব্দ করেছে, যেগুলি ফরেনসিক ও তথ্যগত প্রমাণের জন্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ধৃতদের মধ্যে চারজনকে ইতিমধ্যেই রবিবার আদালতে পেশ করা হয়েছে এবং বাকি চারজনকে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। ধৃতদের সম্পূর্ণ ভ্রমণ পরিকল্পনা, তারা ঠিক কোন গোপন পথে ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছিল এবং ভারতের অভ্যন্তরে কোনো সংগঠিত দালাল চক্র বা ‘মিরজাফর’ তাদের এই অনুপ্রবেশ ও টিকিটের বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল কি না, তা জানতে পুলিশ পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়েছিল। বাংলাদেশের সাথে ৮৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে ত্রিপুরার, যার তিন দিকই প্রতিবেশী দেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত। যদিও এই দীর্ঘ সীমান্তের ৯৫ শতাংশেরও বেশি এলাকা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়েছে, তবুও নদী-নালা ও দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের সুযোগ নিয়ে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং মানব পাচার প্রতিনিয়ত ভারতের নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই চরম বাস্তবতাকে মাথায় রেখে ভারত সরকার সম্প্রতি ত্রিপুরা সীমান্তে ‘স্মার্ট বর্ডার ম্যানেজমেন্ট’-এর জন্য একটি পাইলট প্রকল্প চালুর ঘোষণা করেছে। এর লক্ষ্য হলো আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সীমান্ত নজরদারিকে এমন এক স্তরে নিয়ে যাওয়া, যাতে কাঁটাতারের বেড়া গলে কোনো মশা বা জ*ঙ্গিও ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে না পারে। বিমানবন্দর পুলিশের এই সাফল্যকে এক বড়সড় ‘ওয়েকআপ কল’ হিসেবে দেখছে প্রতিরক্ষা মহল।
