পাহাড়-অরণ্য ও চা-বাগানের উপেক্ষিত জীবনগাঁথার অনন্য রূপকার কথাসাহিত্যিক জয়া গোয়ালা: ফিরে দেখা এক লড়াকু সাহিত্য-সফর

লেখক: গোপাল সিং (সাংবাদিক), খোয়াই, ত্রিপুরা

উত্তর-পূর্ব ভারতের তথা ত্রিপুরার প্রান্তিক ও নিম্নবর্গীয় চা-শ্রমিকদের শোষিত, বঞ্চিত অথচ স্পন্দিত জীবনের গল্পকে যিনি মূলধারার বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় সগৌরবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি কথাসাহিত্যিক জয়া গোয়ালা। ১৩ই জুন এই প্রতিভাবান ও লড়াকু সাহিত্যিকের ১২ তম প্রয়াণ দিবস ছিল। তীব্র আর্থিক অনটন আর সামাজিক প্রতিকূলতাকে জয় করে ক্যানভাসে যেভাবে তিনি অবহেলিত সমাজের হাসিকান্না ফুটিয়ে তুলেছেন, তা আজও সমকালীন সাহিত্যজগতে এক অনন্য বাতিঘর। তাঁর প্রয়াণ দিবসের এই বিশেষ মুহূর্তে পুনর্মূল্যায়িত হলো তাঁর জীবনসংগ্রাম, সাহিত্যচর্চা ও কালজয়ী সৃষ্টির উপাদান।
জয়া গোয়ালা ১৯৬৬ সালের ৬ই এপ্রিল ত্রিপুরার এক অত্যন্ত দরিদ্র ও প্রান্তিক শ্রমজীবী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আদি নিবাস ও বেড়ে ওঠা পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার ঐতিহ্যবাহী মনতলা চা-বাগানে। তাঁর পিতা মঙ্গল গোয়ালা ছিলেন ওই চা-বাগানেরই একজন সাধারণ দিনমজুর। শৈশব থেকেই চা-বাগানের রুক্ষ লাল মাটি, শ্রমিকদের ঘাম ও চোখের জলকে খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন তিনি, যা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যিক চেতনার প্রধান জ্বালানি হয়ে ওঠে।
চা-শ্রমিক পরিবারের চরম আর্থিক অনটন ও দৈনন্দিন বেঁচে থাকার লড়াইয়ের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো বেশিদূর অধিগমন করতে পারেননি জয়া। একাদশ শ্রেণীর গণ্ডি পার হওয়ার পর তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনে যতি চিহ্ন পড়ে। তবে কোনো বড় প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও, জীবনের পাঠশালা থেকে তিনি অর্জন করেছিলেন গভীর জীবনবোধ, দারিদ্র্যের নির্মম অভিজ্ঞতা এবং তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। এই অন্তর্দৃষ্টির জোরেই তিনি নিজেকে ত্রিপুরা ও বহিঃরাজ্যের সাহিত্যের মূল স্রোতে এক স্বতন্ত্র আসনে অধিষ্ঠিত করেন।
জয়া গোয়ালার অধিকাংশ গল্পের প্রধান ভিত্তি ছিল চা-বাগানের প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রা, তাঁদের যাপনচিত্র এবং শোষণ-বঞ্চনার করুণ ইতিহাস। তিনি নিজে এই সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ায় তাঁদের সুখ-দুঃখের নিখুঁত দলিল ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন।
ভাষাগত দিক থেকে তাঁর সাহিত্যে এক অভিনব শৈলী লক্ষ করা যায়। তিনি তাঁর রচনায় চা-বাগানের শ্রমজীবী মানুষদের নিজস্ব আঞ্চলিক কথ্য ভাষা ‘ছিলোমিলো’ অত্যন্ত সার্থকতার সাথে ব্যবহার করেছেন। ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘বাংলা নির্ভর বিভাষা’। তাঁর এই অনন্য ভাষাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছে। তাঁর রচিত জনপ্রিয় ও বহুল আলোচিত উপন্যাসগুলির মধ্যে অন্যতম হলো, দেয়াল, মুর্গাঝুটির লাল ধুল এবং তবুও মাদল বাজে।
জয়া গোয়ালার কালজয়ী উপন্যাস ‘দেয়াল’-এর মূল চরিত্র রঞ্জিত মুণ্ডার মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ও জীবনসংগ্রাম আজ পাঠকদের মাঝে বিশেষভাবে স্মরণীয়। সম্পূর্ণ আত্মজীবনীমূলক শৈলীতে রচিত এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য হলো নিম্নবর্গীয় সমাজ থেকে উঠে আসা এক যুবকের নাগরিক জীবনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার চরম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।
চা-বাগানের এক দরিদ্র ঘরের সন্তান রঞ্জিত মুণ্ডা পড়াশোনা করার উদ্দেশ্যে শহরে আসে এবং কবিতা লেখা শুরু করে। একজন সন্তান, পিতা, বন্ধু ও স্বামীর ভূমিকার সমান্তরালে তাঁর ভেতরে এক স্বাধীন ‘আমি’ সত্তার বাস ছিল। কিন্তু শহরের উচ্চবিত্ত ও কৃত্রিম সংস্কৃতির সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে গিয়ে, নিজের অজান্তেই স্ত্রীর সামাজিক চাপে সে ‘রঞ্জিত মুণ্ডা’ থেকে ‘রঞ্জিত মণ্ডল’-এ রূপান্তরিত হয়ে যায়—যা সে নিজেও প্রথমে উপলব্ধি করতে পারেনি। উপন্যাসের শেষলগ্নে এসে এই কৃত্রিম পরিচিতির জন্য তীব্র আত্মদহনে পুড়তে থাকে রঞ্জিত। শহরের ইস্পাত-কঠিন ও মেকি আভিজাত্যের জগৎ থেকে বেরিয়ে সে আবার ফিরে যেতে চায় শৈশবের সেই চেনা চা-বাগানে, তার বাবা-মায়ের কোলে—যেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে শুধু অনাবিল আনন্দ। স্মৃতিকাতরতা ও এই মনস্তাত্ত্বিক সংকটকেই উপন্যাসে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন জয়া।
সাহিত্যজগতে এই অনন্য ও তুলনাহীন অবদানের জন্য জয়া গোয়ালাকে ত্রিপুরার অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ স্মৃতি পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয়। এছাড়াও, তাঁর সাহিত্যের গভীরতা ও সামাজিক প্রাসঙ্গিকতার কারণে প্রতিবেশী রাজ্য আসামের আসাম বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা স্নাতকোত্তর পাঠ্যসূচিতে তাঁর উপন্যাস ও সামগ্রিক সাহিত্য স্থান করে নিয়েছে, যা ত্রিপুরার প্রান্তিক সাহিত্যের জন্য এক বিরাট গৌরব।
২০১৪ সালের ১৩ই জুন, এই লড়াকু ও প্রথাবিরোধী কথাসাহিত্যিক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি আজ সশরীরে আমাদের মাঝে না থাকলেও, উত্তর-পূর্ব ভারতের নিম্নবর্গীয়, দলিত ও প্রান্তিক সাহিত্যের ইতিহাসে ককবরক ও বাংলা সাহিত্য অনুরাগীদের হৃদয়ে জয়া গোয়ালা চিরকাল অম্লান ও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*