গোপল সিং, খোয়াই, ৩০ জুন || ত্রিপুরার জাঁকজমকপূর্ণ পাহাড়ি ও সমতল বেষ্টিত জম্পুইজলা মহকুমার হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীর উচ্চশিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করতে এবার সরাসরি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ হলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক তথা তিপ্রামথা পার্টির কেন্দ্রীয় কোষাধ্যক্ষ ড. সুনীল কলাই। জম্পুইজলা মহকুমায় একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সরকারি ডিগ্রি কলেজ’ স্থাপনের জোরালো দাবি জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডাঃ মানিক সাহা, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তিপ্রামথার প্রধান প্রদ্যোত বিক্রম মাণিক্য দেববর্মা সহ রাজ্যের শীর্ষ নেতৃত্বদের প্রতি একটি খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন তিনি। চিঠিতে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছেন যে, একটি পূর্ণাঙ্গ মহকুমা হওয়া সত্ত্বেও এবং বিশাল সংখ্যার জনজাতি অধ্যুষিত এলাকা হওয়া সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত জম্পুইজলায় কোনো উচ্চশিক্ষার সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। যার ফলে প্রতি বছর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ভালো ফল করেও কেবল দূরত্বের কারণে বহু দরিদ্র পড়ুয়ার পড়াশোনা মাঝপথেই থমকে যাচ্ছে।
ড. সুনীল কলাই তাঁর চিঠিতে জম্পুইজলা মহকুমার বর্তমান শিক্ষাগত সংকট এবং দীর্ঘদিনের জনদাবি পূরণে মুখ্যমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়ে ৪টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রেখেছেন যার মধ্যে রয়েছে জম্পুইজলা মহকুমার ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি নতুন সরকারি ডিগ্রি কলেজ স্থাপনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া, কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি খাস জমি চিহ্নিতকরণ এবং আর্থিক বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা, রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দপ্তরকে দিয়ে অবিলম্বে জম্পুইজলা এলাকায় একটি বাস্তবসম্মত উপযোগিতা সমীক্ষা চালিয়ে কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেওয়া এবং প্রস্তাবিত এই সরকারি কলেজে যেন কলা, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য শাখার পাশাপাশি ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০’ অনুযায়ী বিভিন্ন বৃত্তিমূলক ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক পাঠ্যক্রম চালু করা ইত্যাদি।
চিঠিতে বলা হয়েছে, জম্পুইজলা মহকুমায় একাধিক উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থাকলেও কলেজ না থাকায় ছাত্র-ছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিদিন মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিয়ে দূর-দূরান্তে যেতে হয়। সবচেয়ে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা, গ্রামীণ এলাকার ছাত্র-ছাত্রী এবং ছাত্রীরা। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের পক্ষে যাতায়াত খরচ বহন করা সম্ভব না হওয়ায় অনেক প্রতিভাবান ছাত্র-ছাত্রী, বিশেষ করে মেয়েরা কলেজ স্তরে পৌঁছানোর আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। জম্পুইজলায় একটি কলেজ স্থাপিত হলে স্কুল ছুটের সংখ্যা এক ধাক্কায় বহুলাংশে হ্রাস পাবে, নারী শিক্ষার প্রসার ঘটবে এবং গ্রামীণ ও জনজাতি যুবসমাজের ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে।
মুখ্যমন্ত্রীকে এই খোলা চিঠি পাঠানো ব্যক্তিত্ব ড. সুনীল কলাই কেবল ত্রিপুরার আঞ্চলিক রাজনীতির এক অন্যতম শীর্ষ কাণ্ডারীই নন, তিনি উত্তর-পূর্ব ভারতের গণমাধ্যম ও ককবরক সংস্কৃতির এক প্রথিতযশা নাম। তিনি ত্রিপুরা উপজাতি এলাকা স্বশাসিত জেলা পরিষদ-এর শাসক দল তিপ্রামথা পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সাংবাদিকতা ও জার্নালিজম’ বিভাগের একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। ড. কলাই হলেন প্রথম ককবরক ভাষাভাষি জনজাতি অংশের লোক, যিনি ককবরক ভাষার চলচ্চিত্রের ওপর দেশের ঐতিহ্যবাহী ‘জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া’ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে ইতিহাস গড়েছেন। উত্তর-পূর্ব ভারতের চলচ্চিত্র গবেষণার অগ্রপথিক ড. কলাই নিজে একজন সফল চলচ্চিত্র নির্মাতা। ককবরক ভাষার জনপ্রিয় সিনেমা ‘ক্বথাম কথমা’ তাঁরই সৃষ্টি।
রাজনীতির সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে জম্পুইজলার সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের স্বার্থে একজন শিক্ষাবিদ ও আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের লড়াকু সৈনিক হিসেবে ড. সুনীল কলাইয়ের এই মানবিক ও যৌক্তিক চিঠির পর এখন রাজ্য সরকারের শিক্ষা দপ্তরের ভূমিকার দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে রয়েছে সমগ্র জম্পুইজলাবাসী। সচেতন মহলের আশা, মুখ্যমন্ত্রী ড. মানিক সাহা এই ন্যায্য জনদাবিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
