পদ্মবিলের স্মৃতিসৌধে কুমারী মধুতী রূপশ্রীর ৭৩তম শহীদান দিবস পালিত

গোপাল সিং, খোয়াই, ৩০ মার্চ || রবিবার ছিল পদ্মবিলের ঐতিহাসিক ও রক্তে ধোয়া নারী শহীদ দিবস। এবার শহীদান দিবসের ৭৩তম বার্ষিকী। ১৯৪৯ সালের ২৮শে মার্চ তিতুন প্রথা উচ্ছেদ আর রাজতন্ত্র অবসানের দাবিতে আন্দোলন করে পুলিশের গুলিতে শহীদের মৃত্যু বরণ করেন তিন বীরাংগনা কুমারী মধুতী ও রূপশ্রী। রক্তে রঞ্জিত হয় খোয়াইয়ের পদ্মবিল। রাজ্যের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম শহীদান এটি। গণভোটে সরকার চাই , এটাও ছিল তখনকার আন্দোলনের অন্যতম দাবি। সারা রাজ্যেই শহীদ দিবসটি নারী শহীদ দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। কর্মসূচির আয়োজক মূলত: উপজাতি গণমুক্তি পরিষদ ও সারা ভারত গণতান্ত্রিক নারী সমিতি যৌথভাবে। রাজ্যে এ ডি সি নির্বাচন সপ্তাহের মধ্যেই। তাই নির্বাচনের প্রচারণা চলছে। এই আবহের মাঝেই পদ্মবিলের শহীদ দিবস। স্বাভাবিক ভাবেই এবারের শহীদান দিবসটি নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য্য নিয়ে রাজ্যবাসীর সামনে উপস্থিত হয়েছে। এবারেও শহীদান দিবসের দিনে শহীদ ভূমি পদ্মবিলে তিন শহীদ বীরাংগনা নারীর স্মৃতিসৌধে ফুলের শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছে ঐক্য উন্নয়ন আর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে জয়ী হওয়ার দুর্জয় শপথের দৃপ্ত অংগীকারে। শহীদ স্মৃতি পার্ক চত্বরে হয়েছে জমায়েত। জমায়েতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সিপিআই এম)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অঘোর দেববর্মা ঐক্য উন্নয়ন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে জয়ী হয়ে তিন বীরাংগনার রক্তের ঋণ শোধ করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। শুরুতেই শহীদ বেদীমূলে তিনটি প্রদীপ জ্বালিয়ে চেতনার অগ্নি শিখা প্রজ্বলন করেন গণ আন্দোলনের নেতা অঘোর দেববর্মা, উপজাতি গণমুক্তি পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সভাপতি রঞ্জিত দেববর্মা ও সারা ভারত গণতান্ত্রিক নারী সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যা ছায়া বল। এরপর ফুল মালায় একে একে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন অঘোর দেববর্মা, রঞ্জিত দেববর্মা, ছায়া বল, জি এম পি-র সহ সম্পাদক পদ্ম কুমার দেববর্মা, সংগঠনের বিভাগীয় সম্পাদক সুবোধ দেববর্মা, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নরেশ দেববর্মা, সারা ভারত গণতান্ত্রিক নারী সমিতির জেলা সম্পাদিকা গায়েত্রী দত্ত, জেলা সভানেত্রী রাধারাণী দেববর্মা, মহকুমা সম্পাদিকা গৌরী পাল, গণ আন্দোলনের নেতা আলয় রায়, নির্মল বিশ্বাস সহ বিভিন্ন গণ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা। শহীদ স্মরণে নিবেদিত হয় মৌন শ্রদ্ধা। রাধারাণী দেববর্মা, গৌরী পাল ও সুবোধ দেববর্মাকে নিয়ে সভাপতি মন্ডলী গঠন করে জমায়েতের কাজ শুরু হলে বক্তব্য রাখেন সি পি আই (এম)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অঘোর দেববর্মা, উপজাতি গণমুক্তি পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সভাপতি রঞ্জিত দেববর্মা, সহ সম্পাদক পদ্ম কুমার দেববর্মা ও সারা ভারত গণতান্ত্রিক নারী সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যা ছায়া বল। জমায়েতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অঘোর দেববর্মা বলেন, ৭৩ বছর পরেও কুমারী মধুতী রূপশ্রীর সংগ্রাম ও এদের অমর আত্মবলিদানের ইতিহাস সমান প্রাসংগিক। তিন শহীদ বীরাংগনার রক্তস্নাত গৌরবগাঁথার গর্বিত কাহিনী আজো মানুষের স্মৃতিতে ভাস্বর ও চেতনায় উজ্জ্বল। পদ্মবিলের ঐতিহাসিক অমর শহীদান আজো রাজ্য ও দেশের মানুষকে আগামী দিনের লড়াই সংগ্রামে উজ্জীবিত করে, অণুপ্রাণিত করে। কুমারী মধুতী রূপশ্রীর আত্মত্যাগের বিনিময়ে কষ্টার্জিত অধিকার রক্ষায় আমাদের লড়াই সংগ্রামকে আরো মজবুত করতে হবে। শহীদের রক্তের বিনিময়ে রাজতেন্ত্রর অবসান হয়েছে। তিতুন প্রথা উচ্ছেদ হয়েছে। গণভোটের মাধ্যমে সরকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। কিন্তু আজ রাজ্যে ও দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করে চরম সাম্প্রদায়িক দলের মদতপুষ্ট রাষ্ট্রীয় শক্তি একদলীয় রাজনীতির শাসন ব্যবস্থা ও একনায়কতন্ত্র কায়েম করতে চাইছে। বিজেপি’র শাসনে ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। বাক স্বাধীনতা ও স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার আক্রান্ত। আক্রমণের শিকার সংখ্যালঘু অংশের মানুষ। সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করে মত প্রকাশ করলেই তাকে বলা হচ্ছে দেশদ্রোহী। আর নিজেরা সাজছে দেশপ্রেমিক। অথচ, এটাই ইতিহাস যে, বিজেপি-আরএসএস দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় বৃটিশদের দালালি করেছে। এই অবস্থায় সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে দুর্বার লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জাতীয় সংহতির ভিত্তিকে আরো সুদৃঢ় করে গড়ে তোলার শপথ নিতে হবে। অঘোর দেববর্মা বলেন, রাজতেন্ত্রর যুগে ১৮৫ জন রাজা সাড়ে তেরশো বছর রাজত্ব করেছেন। রাজারা সবাই ছিলেন উপজাতি। কিন্তু উপজাতি হয়েও ওরা উপজাতিদের জন্য কোন কাজ করেন নি। একজন রাজাও উপজাতি কল্যাণে সামান্যতম কাজ করে যান নি। বরং ওরা সহজ সরল নিরীহ উপজাতিদেরকে শাসনের নামে ক্রমাগত শোষণ করে গেছেন। রাজাদের চরম অত্যাচার, দমণ পীড়ন আর নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে উপজাতিদের। তিতুন প্রথার মতো নিষ্ঠুর আচরণ নীরবে সইতে হয়েছে প্রজাদের। বিনে পারিশ্রমিকে বেগার খাটতে হয়েছে। রাজার দাস করে রাখা হয়েছে প্রজাদের। রাজতেন্ত্রর অবসান হলে কংগ্রেসের সরকার হয়। কংগ্রেস ও ছিল উপজাতি বিদ্বেষী। কংগ্রেস সরকারের সময়ে ও উপজাতিরা উন্নয়নের স্বাদ পায় নি। আজ যারা তিপ্রাল্যান্ড বা গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ডের শ্লোগান তুলে রাজ্যের উপজাতিদের মন গলাতে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে ভোটের বৈতরণী পার হতে চায়, ওরাও রাজা বা কংগ্রেসের শাসকদের মতো মেকী উপজাতি দরদী। কংগ্রেসের মতো বিজেপি’ও উপজাতি বিদ্বেষী। কোন কর্মসূচি নেই ওদের, কোন ন্যায় নীতি নৈতিকতার বালাই নেই, শুধু ভোটের সময় এসে বলছে তিপ্রাল্যান্ড আর গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ড। উপজাতিদের কল্যাণ ওদের উদ্দেশ্য নয়। আসলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপকৌশল। তিনি বলেন, আজ যখন এ ডি সি নির্বাচনে তিপ্রাল্যান্ড বা গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ডের শ্লোগান তুলে রাজ্যের জাতি উপজাতি মানুষের সম্মিলিত ঐক্য সম্প্রীতির মেলবন্ধনকে দুর্বল করে তোলা হচ্ছে, তখন আমাদেরকে ঐক্য সম্প্রীতির মেলবন্ধনকে অটুট রাখার জন্য লড়তে হবে। উন্নয়নের জন্য লড়তে হবে। একই সাথে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও অধিকার রক্ষার জন্যও লড়তে হবে। এই লড়াই সংগ্রামে জয় সুনিশ্চিত করতে হবে আমাদের। আর এর মধ্য দিয়েই কুমারী মধুতী রূপশ্রীর রক্তের ঋণ শোধ করার দুর্জয় শপথ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। যুবশক্তিকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে ধুরন্ধর রাজনীতির কারবারীরা। সম্ভবনাময় যুবশক্তিকে বিপথে পরিচালিত করা হচ্ছে। এই ষড়যন্ত্রের শিকড় উপড়ে না ফেলতে পারলে আমাদের সামনে সমূহ বিপদ অপেক্ষা করছে। তিনি বলেন, আমরা কুমারী মধুতী রূপশ্রীর উত্তরাধিকারী। রাজ্যের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসকে আমরা কখনোই ম্লান হতে দিতে পারি না। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন, যুবরা বিপথগামী না হয়। এদের সামনে অতীত দিনের গৌরবোজ্বল সংগ্রামের শিক্ষা ও প্রয়াত নেতৃবৃন্দের আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরতে হবে। তিপ্রাল্যান্ড বা গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ড হলো অলীক কল্পনা ও অবাস্তব। যা কোন দিনই সম্ভব নয়। এগুলো হলো আলেয়ার আলো। বর্তমান প্রজন্মের ছাত্র যুবদের ঐক্য উন্নয়নে ও গণতন্ত্রের পথেই পরিচালিত করতে হবে। অঘোর দেববর্মা বলেন, এ ডি সি আমাদের দীর্ঘ দিনের লড়াই সংগ্রামের ফসল। এই এ ডি সি দীর্ঘ দিন ধরে পরিচালনা করছে বামফ্রন্ট। যার সুফল ভোগ করছেন মানুষ। বিশেষ করে উপজাতিরা। আসলে বামফ্রন্টের সরকারের সময়েই উপজাতিদের প্রকৃত উন্নয়নের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। ২০০০ সালে আই পি এফ টি সন্ত্রাসবাদীদের সহায়তা নিয়ে পাঁচ বছরের জন্য এ ডি সি দখল করে। পাঁচ বছরে পাঁচ জন মূখ্য নির্বাহী সদস্য অদল বদল করতে হয়। ১৯৮৮ সালেও তো টি ইউ জে এস বসে এডি সিতে। কি উন্নয়ন হয়েছে তখন তা রাজ্যবাসীর জানা। আসলে উপজাতিদের উন্নয়নের জন্য বামফ্রন্টের বিকল্প নেই, বলে অবিহিত করেন তিনি।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*