গোপাল সিং, খোয়াই, ০৬ জানুয়ারি || স্বাধীনতার অনেক আগেই খোয়াই জেলার প্রথম চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করা মহারাজগঞ্জ বাজারের স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি আজ চরম অবহেলার শিকার। শেষ অবধি বাম আমলে এটি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু পরিবর্তনের সাক্ষী থাকা এই প্রতিষ্ঠান বর্তমানে কার্যত ভগ্নদশায় পরিণত হয়েছে, যা জেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায় হিসেবেই ধরা পড়ছে।
ইতিহাস বলছে, প্রাথমিকভাবে ছন ও বাঁশের ঘরে শুরু হওয়া এই চিকিৎসা কেন্দ্রই ছিল তৎকালীন খোয়াই জেলার একমাত্র ভরসা। পরবর্তীতে এটি পাকা ভবনে রূপ নেয়। যখন বর্তমান খোয়াই জেলা হাসপাতাল নির্মিত হয়, তখন এই কেন্দ্রটি হাসপাতালের বহির্বিভাগ বা আউটডোর হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। শেষ পর্যায়ে বাম আমলে এটি একটি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে পুনর্গঠিত হয়।
এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে খোয়াইয়ের গৌরবময় ইতিহাস। স্বাধীনতার পূর্বে এখানে প্রথম চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন প্রখ্যাত নাট্যকার প্রয়াত হীরেন্দ্র সিনহার পিতা স্বর্গীয় কৈলেস্বর সিনহা, যাকে বিশেষভাবে কৈলাসহর থেকে খোয়াইয়ে আনা হয়েছিল। আজ সেই ইতিহাস প্রায় বিস্মৃতির অতলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় এই আয়ুর্বেদিক কেন্দ্রে নিয়োজিত চিকিৎসকেরা ধীরে ধীরে বদলি হয়ে যান। বর্তমানে দুইজন চিকিৎসককে খোয়াই জেলা হাসপাতালে বসানো হয়েছে। চিকিৎসক ও পরিকাঠামোর অভাবে কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। জনসাধারণের অর্থে নির্মিত আধুনিক ভবনটি এখন জঙ্গলাকীর্ণ, চারপাশে আবর্জনা জমে রয়েছে। সাইনবোর্ড ছাড়া আর কিছুই যেন অস্তিত্বের জানান দেয় না। দিনের আলোতেও ভবনটি পরিত্যক্ত ও নিস্তব্ধ, স্থানীয়দের ভাষায় ‘ভূতের বাড়ি’র মতো।
এদিকে বর্তমান সরকার ও খোয়াই পুর পরিষদ শহরের ঐতিহ্য রক্ষা করে আধুনিক খোয়াই গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও, মহারাজগঞ্জ এলাকার চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। একসময় খোয়াইয়ের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মহারাজগঞ্জ বাজার আজ অনেকটাই জৌলুস হারিয়েছে।
এই এলাকায় একটি প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ ‘হরি মন্দির’ রয়েছে, যেখানে বহু পুরনো মূর্তি সংরক্ষিত। দুর্গাপূজা ও রথযাত্রার সময় কিছুটা প্রাণচাঞ্চল্য দেখা গেলেও বছরের অধিকাংশ সময় এলাকাটি নিস্তেজ থাকে। অতীতে এখানে একটি সিনেমা হলও ছিল, যা পরে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুভাষপার্ক বাজার নতুন বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে, আর মহারাজগঞ্জ বাজার ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে থাকে।
যদিও এখনও খোয়াই থানা, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর, পোস্ট অফিস ও তহশিল অফিস মহারাজগঞ্জ এলাকাতেই অবস্থিত, তবুও খোয়াইয়ের প্রথম বাজার হিসেবে এর ঐতিহ্য আজ অনেকটাই ফিকে। একসময় সীমান্ত হাটের পরিকল্পনায় বাসস্ট্যান্ড স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলেও, বর্তমান ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে সেই পরিকল্পনা আদৌ বাস্তবায়িত হবে কিনা, তা ভবিষ্যতের গর্ভেই রয়ে গেছে।
খোয়াইয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকা এই আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা কেন্দ্র ও মহারাজগঞ্জ এলাকা পুনরুজ্জীবিত করতে প্রশাসনের সুদৃষ্টি এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
