আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে খোয়াইয়ে ইতিহাসের ছোঁয়া — শতাধিক কবির কণ্ঠে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন

গোপাল সিং, খোয়াই, ২২ ফেব্রুয়ারী || সংস্কৃতির শহর খোয়াই আবার প্রমাণ করল— ভাষা বেঁচে থাকে মানুষের কণ্ঠে, কবিতায়, আর সম্মিলিত চেতনায়। শতাধিক আমন্ত্রিত কবির নক্ষত্র সমাবেশে মাতৃভাষা ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলো খোয়াইতে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সংস্কৃতির শহর খোয়াই সাক্ষী থাকল এক ব্যতিক্রমী সাহিত্য–ইতিহাসের। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শতাধিক আমন্ত্রিত কবির সম্মিলিত উপস্থিতিতে স্থানীয় স্বপনপুরী অডিটোরিয়াম যেন রূপ নিল ভাষা ও কবিতার নক্ষত্রমেলায়। আজকের ভাষা, মৈত্রী সংসদ ও প্রকাশনা মঞ্চ-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান মাতৃভাষা ও ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
২১শে ফেব্রুয়ারি বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হলেও ২২শে ফেব্রুয়ারিতেও খোয়াই শহর মাতল ভাষার আবেগে। অনুষ্ঠান শুরুতেই ভাষা শহীদদের প্রতি পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…” গানের আবেগঘন পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উপস্থিত সকলে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন ভাষা আন্দোলনের শহীদদের। এরপর শুরু হয় মূল পর্ব।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন খোয়াই পুর পরিষদের চেয়ারপার্সন দেবাশীষ নাথশর্মা। উদ্বোধনী মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সমাজসেবী ও সাহিত্যানুরাগী বিনয় দেববর্মা, অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক তথা ত্রিপুরা বক্সিং অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য সভাপতি অভিজিৎ দত্ত ভৌমিক এবং যুগ্ম আহ্বায়ক তথা আজকের ভাষা সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক দীপেন নাথশর্মা। সভাপতি মণ্ডলীতে ছিলেন ড. দেবব্রত দেবরায়, নিয়তি রায়বর্মন, মন্টু দাস, গৌরাঙ্গ চন্দ্র দেবনাথ, ড. মজাহিদ রহমান ও বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী।
এদিনের মঞ্চে প্রকাশিত হয় সাহিত্য বিষয়ক ফোল্ডার। মধুমিতা দত্তের সম্পাদনায় মৈত্রী সংসদের উদ্যোগে এবং প্রকাশনা মঞ্চ ও আজকের ভাষা-র সহযোগিতায় প্রকাশিত একটি ফোল্ডারে নির্বাচিত ছয়জন লেখকের রচনা স্থান পায়। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কবি অনিমেষ ঋষিদাস-এর সম্পাদনায় ‘ত্রিধারা’ নামে আরেকটি ফোল্ডার প্রকাশিত হয়, যেখানে ছয়জন কবির লেখা সংকলিত হয়েছে। দুটি ফোল্ডারই অনুষ্ঠানে উপস্থিত কবি ও অতিথিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এদিকে প্রতিটি কবির কবিতা পাঠের পর প্রদান করা হয় ভাষা সম্মাননা ও স্মারক, যা অনুষ্ঠানের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করে।
উদ্বোধনী আলোচনায় প্রধান অতিথি বিনয় দেববর্মা ভাষা বৈচিত্র্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, উত্তর–পূর্বাঞ্চলে দুই শতাধিক ভাষার অস্তিত্ব থাকলেও অনেক ভাষাই আজ বিলুপ্তির পথে। ত্রিপুরায় অধিকাংশ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বললেও প্রায় ২৬ শতাংশ মানুষ ককবরক ভাষাভাষী, অথচ জনজাতি অংশের বহু মানুষের এখনও মাতৃভাষায় শিক্ষার পূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়নি—যা ভাষা আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি বিষয়।
অপরদিকে আহ্বায়ক অভিজিৎ দত্ত ভৌমিক ১৯৬১ সালের বরাক উপত্যকার ১১ জন ভাষা শহীদের আত্মত্যাগের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ৭০ ও ৮০–র দশকে খোয়াই ছিল এক উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, যদিও ৯০–এর দশকে সেই ধারা কিছুটা স্তিমিত হয়ে যায়। বর্তমানে পুনরায় খোয়াইয়ের সাংস্কৃতিক গৌরব ফিরিয়ে আনার যে প্রচেষ্টা চলছে, এই আয়োজন তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধক দেবাশীষ নাথশর্মা এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, শতাধিক কবির সম্মিলিত অংশগ্রহণ ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতার পরিচয় বহন করে এবং এ ধরনের আয়োজন ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে বলেই তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সঙ্গীত ও কবিতার অপূর্ব মেলবন্ধনে দিনভর অনুষ্ঠান প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কবিতার উচ্চারণে, সুরের আবেশে এবং ভাষার আবেগে খোয়াই শহর যেন নতুন করে নিজের সাংস্কৃতিক আবহ ফিরে পেল। এই আয়োজন শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়— এ ছিল ভাষার প্রতি ভালোবাসার ঘোষণা, সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের ইঙ্গিত, আর ইতিহাস রচনার এক উজ্জ্বল মুহূর্ত।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*