সুব্রত দাস, গন্ডাছড়া, ১৭ জুলাই || রাজ্য সরকারের আন্তরিক কৌশল আর প্রশাসনের প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতায় ফিরছে গন্ডাছড়া মহকুমা। মানসিক আতঙ্ক আর সন্দেহ পুরো না কাটলেও জেলা শাসকের লাগাতার পরিশ্রমে এবং জেলা পুলিশ সুপারের অক্লান্ত কাজে অনেকটাই আগের চেনা ছন্দে ফিরেছে মহকুমা। বুধবার অন্তত দিনভর বাজারে মানুষের আনাগোনা, ক্রেতা বিক্রেতার ভিড় আর আলাপ চারিতার পুরোনো সেই ছবি আবার ফিরে এসেছে।
তবে গন্ডাছড়া দ্বাদশ শ্রেণী বিদ্যালয়ের দুটি শিবিরে আশ্রয় নেওয়া ১০৭ পরিবারের মোট ৪৩৫ জন মানুষ যাদের মধ্যে এক বছরের শিশুও রয়েছে ৭ জন তারা অধীর আগ্রহে চাইছেন ঘরে ফিরতে। ক্ষতি মিটিয়ে নিতে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি স্থানীয় আনন্দমেলার আসরে এক অনাকাঙ্খিত ঝামেলায় পড়ে মার খান মহকুমার কলেজ পড়ুয়া পরমেশ্বর রিয়াং। গত শুক্রবার সকালে জিবি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এতে আতঙ্ক ছড়ায় মহকুমায়। প্রতিহিংসার আগুন উস্কে দেওয়া হয়। শুক্রবার রাতে প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ে ছাই হয় কমপক্ষে ৭০টি বাড়ি এবং ৪৪টি দোকান। পুড়ে যায় যান বাহন, সহায় সম্পত্তি এমনকি গবাদি পশুও। শনিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সর্বস্ব হারানো ১০৭ পরিবারের ৪৩৫ জনকে গন্ডাছড়া দ্বাদশ শ্রেণী বিদ্যালয়ে দুটি বিল্ডিংয়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় দেয় প্রশাসন। রবিবার মহকুমায় আসেন ধলাই জেলা শাসক সাজু ওয়াহিদ এ। তিনি প্রশাসনিক কর্তা, ব্যবসায়ীবৃন্দ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতিনিধি, জন প্রতিনিধি দের সঙ্গে বৈঠক করেন। শরণার্থী শিবির সফরে গিয়ে মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়েন তিনি। আশ্বাস দেন দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও যথাযথ ব্যবস্থার। সোমবার মহকুমায় আসেন রাজ্য সরকারের মন্ত্রী টিংকু রায়, প্রাক্তন সংসদ রেবতী ত্রিপুরা, সুবল ভৌমিক এবং রামপদ জমাতিয়া। প্রশাসনিক অগ্রগতির খবরা খবর নিতে আসেন তারা। দেখা করেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সঙ্গে। প্রবল ক্ষোভ ও যন্ত্রণা উগরে দেন মানুষ। এমনকি ভাঙচুর করা হয় এস ডি এম অফিস। তারা আশ্বস্ত করেন সরকার এই সমস্যা নিয়ে খুবই আন্তরিক। খোদ মুখ্যমন্ত্রী নিজে দেখছেন গোটা বিষয়। খুব তাড়াতাড়ি প্রয়োজনীয় সাহায্য পাবেন মানুষ। কিছুটা প্রশমিত হয় ক্ষোভ।
কিন্তু মঙ্গলবার ভোর রাত তিনটে নাগাদ ফের অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হয় তিনটি দোকান। ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী ও স্থানীয় মানুষের রাগ সামাল দিতে লাঠি চার্জ করে প্রশাসন। মঙ্গলবার দুপুরে আবার মহকুমায় ছুটে আসেন জেলা শাসক সাজু ওয়াহিদ এ। প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর স্থানীয় দুর্গা বাড়ি নাট মন্দিরে ব্যবসায়ীদের নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন জেলা শাসক। তাদের আশ্বস্ত করেন দোকান বাজার চালু করলে যে কোন পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন তাদের সঙ্গে থাকবে। এর ফলে বুধবার বিকাল থেকে খুলে যায় দোকান পাঠ, চালু হয় বাজার। চারদিন পর বাজার চালু হওয়ায় মানুষ ভিড় জমান বাজারে। চলে কেনাকাটা। গাড়িঘোড়াও চলতে শুরু করে। যদিও যাত্রী তুলনায় অনেক কম। সেই সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যের বাতাবরণ আবার ফিরে আসতে শুরু করে।
এখন শরণার্থী শিবিরে থাকা ১০৭ পরিবারকে বাড়িতে ফেরানো প্রধান কাজ প্রশাসনের। শিবিরে আশ্রয় নেওয়া মানুষেরা চাইছেন ফিরে যেতে। সেই লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে প্রশাসন। এদিকে হরিপুর, ৬ কার্ড, ৭ কার্ড এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা জোরালো দাবি তুলেছেন তাদের নিরাপত্তা ক্যাম্পটি ৩৩ কেভি এলাকায় পুরাতন মোটরস্ট্যান্ডে বসানো হোক। এই বিষয়েও সব দিক খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন। সব মিলিয়ে গন্ডাছড়া আবার ফিরছে স্বাভাবিক ছন্দে।
