প্রশাসনিক শিবিরে ‘রুদ্রমূর্তি’ সরকারি কর্মীর, দুয়ারে সরকারি পরিষেবা দিতে গিয়ে জনভোগান্তি ও অপমানের চরম নজির

গোপল সিং, খোয়াই, ১৭ জুন || প্রশাসনকে সাধারণ মানুষের এক্কেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এবং এক ছাদের নীচে সমস্ত সরকারি সুযোগ-সুবিধা হাতের নাগালে পাইয়ে দিতে বর্তমান রাজ্য সরকার প্রতিনিয়ত নানামুখী সদিচ্ছা ও প্রয়াস জারি রেখেছে। কিন্তু সরকারের সেই সদিচ্ছা ও ভাবমূর্তিকে একশ্রেণির দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বদমেজাজী সরকারি কর্মচারীদের একাংশ কীভাবে কালিমালিপ্ত করছে, আজ তারই এক চরম ও নগ্ন চিত্র ফুটে উঠল খোয়াই নতুন টাউন হলের প্রশাসনিক শিবিরে। ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে ক্যামেরার সামনে কেউ মুখ খুলতে রাজি না হলেও, আজ দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষকে সরকারি সুবিধা দেওয়া তো দূর অস্ত, উল্টে এক নারী কর্মকর্তার অভব্য আচরণ, চরম অপমান এবং দিনভর হয়রানির শিকার হয়ে পরিশেষে নিরাশ ও রক্তাক্ত মন নিয়ে বাড়ি ফিরতে হলো নাগরিকদের।
আজ খোয়াইয়ের এই বিশেষ প্রশাসনিক শিবিরে সকাল থেকেই বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষ সহ শহরের শিক্ষিত অংশের নাগরিকরা ভিড় জমিয়েছিলেন। মূলত ম্যারেজ সার্টিফিকেট, পিআরটিসি সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি শংসাপত্র ও নথি সংগ্রহের স্টলগুলিতেই মানুষের ভিড় ছিল সবচেয়ে বেশি। আর ঠিক এই ম্যারেজ সার্টিফিকেটের স্টলেই আজ এক্কেবারে ‘রুদ্রমূর্তি’ ধারণ করে বসেছিলেন প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অনুরূপা নাগ।
অভিযোগ, সকাল থেকেই তিনি শিবিরে আসা সুবিধাভোগীদের নান বাহানায় নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছিলেন। চরম বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থার পারদ চড়ে বিকেল তিনটে নাগাদ, যখন নিজের লাঞ্চ বা দুপুরের খাবার খাওয়ায় ব্যস্ত ছিলেন ওই কর্মী। সেই সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত সাধারণ মানুষ নিজের দরকারি কাগজপত্রের কথা জিজ্ঞেস করতেই তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন অনুরূপা নাগ। উপস্থিত নাগরিকদের উদ্দেশ্যে তিনি যারপরনাই অত্যন্ত কুরুচিকর ও অপমানজনক ভাষা প্রয়োগ করেন বলে অভিযোগ। এক সরকারি কর্মকর্তার মুখে এমন ভাষা শুনে লজ্জায় ও অপমানে বহু সাধারণ মানুষ সেই মুহূর্তে শিবির ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
লজ্জাজনক বিষয় হলো, ওই স্টলে থাকা অন্যান্য সহকর্মীরা অনুরূপা নাগের এই অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করা তো দূর, উল্টে তাঁর পক্ষ নিয়ে সুর চড়ান এবং উপস্থিত নাগরিকদের হয়রানি দেখে হাসাহাসি করতে থাকেন। শিবিরে তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রশাসনের কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে সেই সময় ওই চত্বরে দেখা যায়নি। ফলে জনগণের হয়ে প্রতিবাদ করার মতো কেউ সেখানে উপস্থিত ছিল না। শিবিরে এসে এমন পরিষেবা ও অপমানের নমুনা দেখে ক্ষুব্ধ নাগরিকদের অনেকেই বলতে শুরু করেছেন, “প্রশাসনের দুয়ারে বা শিবিরে এসে এমন চরম ভোগান্তি ও অপমানিত হওয়ার থেকে ভালো, স্থানীয় কোনো সিএসসি-তে গিয়ে টাকা খরচ করে কাজ করিয়ে নেওয়া।”
অভিযোগ এখানেই শেষ নয়, ম্যারেজ সার্টিফিকেট ইস্যু করার নাম করে তিনি বহু সুবিধাভোগীর কাছ বিভিন্নরকম নথিপত্র দাবি করছিলেন, যার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। মূলত সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে শিবির থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই তিনি এই চাপ সৃষ্টি করছিলেন বলে ভুক্তভোগীদের দাবি। কিন্তু বিনামূল্যে সরকারি পরিষেবা পেতে আসা এই গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষদের মুখে কোনো প্রতিবাদের শব্দ ছিল না। কারণ, অসহায় মানুষের নীরব অপমানের কোনো ভাষা হয় না।
অনুরূপা নাগ নামে এই সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে ক্ষোভের আগুন শুধু আজকের শিবিরেই সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, নিজের মূল অফিসে বসেও তিনি দিনের পর দিন সাধারণ মানুষকে এভাবেই বিভ্রান্ত ও হয়রানি করে আসছেন। নিয়মিত অফিস কামাই করা এই কর্মীর দূরভিসন্ধির কারণে মানুষ বাধ্য হন সরকারি নিখরচায় পরিষেবা না পেয়ে স্থানীয় কোনো প্রাইভেট সিএসসি থেকে মোটা টাকা খরচ করে কাজ হাসিল করতে। এর নেপথ্যে কোনো গোপন ‘কমিশন বাণিজ্য’ বা দালাল চক্রের যোগসূত্র রয়েছে কিনা, তা নিয়েও আজ প্রকাশ্যেই গুঞ্জন ও অভিযোগ তুলতে শুরু করেছেন খোয়াইয়ের সচেতন নাগরিকরা। এমনকি অফিস সূত্রে খবর, অনুরূপা নাগ কেবল আমজনতার সাথেই নয়, নিজের অফিসের অন্যান্য সহকর্মীদের সাথেও প্রতিনিয়ত অত্যন্ত অভব্য ও উগ্র আচরণ করে থাকেন।
আজকের এই প্রশাসনিক শিবিরের চরম অব্যবস্থা ও এক কর্মীর একনায়কতন্ত্রের জেরে বিনামূল্যে পরিষেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে শেষ অবধি বেসরকারিভাবেই রাজ্য সরকারের পরিষেবা পেতে বাধ্য হলেন খোয়াইবাসী। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় বেতনভোগী হয়েও যারা এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে সরকারের ভাবমূর্তি ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার খেলায় মেতেছেন, সেই অনুরূপা নাগের মতো দায়সারা ও উদ্ধত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে রাজ্য প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর কি আদৌ কোনো শাস্তিমূলক বা বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে? নাকি সরকারি অফিস আর প্রশাসনিক শিবিরের চক্কর কেটে সাধারণ জনগণকে এভাবেই প্রতিনিয়ত অপমান আর বিভ্রান্তির শিকার হতে হবে—এখন সেটাই দেখার।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*