বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্যসাধক বিমান ধরের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ ত্রিপুরা, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বিমান ধর ও তাঁর নাতির, গভীর শোক প্রকাশ মুখ্যমন্ত্রীর

আপডেট প্রতিনিধি, আগরতলা, ২২ অক্টোবর || বিশিষ্ট সাংবাদিক, শিক্ষক ও সাহিত্যসাধক বিমান ধরের আকস্মিক প্রয়াণে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে ত্রিপুরার সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক মহলে। বৃহস্পতিবার সকালে নাতি রাজীব পালকে সঙ্গে নিয়ে বাগমা–কড়ইমুড়া যাওয়ার পথে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি। একই দুর্ঘটনায় তাঁর নাতি রাজীব পাল (২৭)-এরও মৃত্যু হয়েছে। তাঁকে জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন বলে জানা গেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ মানিক সাহা।
মুখ্যমন্ত্রী নিজের সামাজিক মাধ্যমে শোকবার্তায় লেখেন, “বরিষ্ঠ সাংবাদিক, লেখক এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ শ্রী বিমান বিহারী ধর মহাশয় এবং তাঁর নাতির পথ দুর্ঘটনায় অকালপ্রয়াণে গভীরভাবে শোকাহত।” শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে তিনি প্রয়াতদের আত্মার চিরশান্তি কামনা করেন। পাশাপাশি এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি শোকসন্তপ্ত পরিবারকে দেওয়ার জন্য পরম করুণাময় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানান।
১৯৪২ সালে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার কুমিল্লা শহরে জন্মগ্রহণ করেন বিমান ধর। ১৯৪৮ সালের গোড়ার দিকে দেশত্যাগ করে পরিবারের সঙ্গে উদয়পুরে বসবাস শুরু করেন তিনি। জন্মসূত্রে কুমিল্লার মানুষ হলেও তাঁর বেড়ে ওঠা এবং শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অতিবাহিত হয় ত্রিপুরায়। পরবর্তীকালে আগরতলার এমবিবি কলেজ থেকে ১৯৬৩ সালে বাণিজ্যে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনের সূচনা শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে হলেও ক্রমে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চা তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। প্রথাগত সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ না থাকলেও সংবাদ সংগ্রহ, সংবাদ পরিবেশন এবং সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরার প্রতি গভীর আগ্রহ তাঁকে এই পেশায় আকৃষ্ট করেছিল। ১৯৬৮ সাল থেকে তিনি দৈনিক সংবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি আকাশবাণী, আগরতলা কেন্দ্রের সংবাদ বিভাগে প্রায় তিন দশক জেলা সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে বিমান ধর সাংবাদিকতাকে শুধু পেশা হিসেবে দেখেননি, বরং সমাজ ও মানুষের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ স্থাপনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর লেখনী ও সংবাদ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে সমাজের নানা বাস্তবতা এবং মানুষের জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিক।
শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতার ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁর সাহিত্যচর্চা অব্যাহত ছিল। কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘সংশপ্তক’ পত্রিকার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। মানস দেববর্মন, কালীপদ চক্রবর্তী ও কিরণশঙ্কর করের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদনার কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি। অবসর গ্রহণের পরও লেখালিখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট ছিল।
তাঁর সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক মননে প্রতিফলিত হয়েছে সমাজসচেতনতা, প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা এবং দুই বাংলার ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলার আন্তরিক প্রয়াস। শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা ও সাহিত্যসাধনাকে একসূত্রে বেঁধে তিনি নিজের কর্মজীবনে যে স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছিলেন, তা তাঁকে দীর্ঘদিন স্মরণীয় করে রাখবে।
বিমান ধরের আকস্মিক প্রয়াণে ত্রিপুরা হারাল এক অভিজ্ঞ সাংবাদিক, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির এক আন্তরিক সাধককে। অন্যদিকে, একই দুর্ঘটনায় তাঁর নাতি রাজীব পালের মর্মান্তিক মৃত্যুও পরিবার-পরিজনদের গভীর শোকের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এই কঠিন সময়ে শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ মানিক সাহা। বিমান ধরের কর্মময় জীবন, সাংবাদিকতার প্রতি নিষ্ঠা, সাহিত্যচর্চা এবং সাংস্কৃতিক বন্ধন দৃঢ় করার প্রচেষ্টা আগামী দিনেও মানুষের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*