খোয়াইয়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম অব্যবস্থা! বনেদী স্কুলের মুল গেইট বিগত প্রায় ৫৮ বছর যাবত ভগ্ন অবস্থায়! রাস্তার ধারে নষ্ট হচ্ছে সরকারি সম্পত্তি!

গোপাল সিং, খোয়াই, ১৩ ডিসেম্বর || খোয়াইয়ে শিক্ষা দপ্তরের উদাসীনতা ও অব্যবস্থাপনার জেরে শিক্ষাঙ্গনে নেমেছে চরম অরাজকতা। ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ যেখানে নিয়মিত তছনছ হচ্ছে, সেখানে সরকারি সম্পত্তিও বছর পর বছর অবহেলায় রাস্তার ধারে পড়ে পচে নষ্ট হচ্ছে। একটি বিদ্যালয়ে খোয়াই জেলা শিক্ষা দপ্তর এবং অপরটিতে খোয়াই বিদ্যালয় পরিদর্শকের অফিস মাত্র ১০০ মিটারের দূরত্বে থাকা সত্ত্বেও দপ্তরের নজর নেই এদিকে।
আশ্চর্য্য হলেও সত্যি, খোয়াই সরকারী দ্বাদশ শ্রেণি বিদ্যালয়ের মুল ফটকের জরাজীর্ণ অবস্থার ভেতর দিয়েই রাজ্যের বর্তমান ও পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী ও আমলারা অগণিতবার সরকারী অনুষ্ঠানে যোগ দিলেও, ১৯৬৭ ইং সালের (তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন শচীন্দ্র লাল সিং) পর থেকে আজ অবধি জরাজীর্ণ লোহার গেইট সংস্কারও হলোনা, নতুন গেইটও লাগানো হলেনা। বিগত প্রায় ৫৮ বছর ধরে খোয়াইয়ের বনেদী স্কুলের গেইট ভগ্ন অবস্থায় জেলা সদর খোয়াইয়ের শোভাবর্ধন করছে। নজর নেই প্রশাসনের।
অপরদিকে খোয়াই সরকারী দ্বাদশ শ্রেণি বালিকা বিদ্যালয়ের নতুন বিল্ডিং উদ্বোধন হয়েছে বহু বছর আগে। খোয়াইয়ের প্রথম দিকের স্কুল। কিন্তু নতুন বিল্ডিং, নতুন গেইট পেয়ে পুরনোকে হেলায় রাস্তার ধারে জরাজীর্ণ অবস্থায় ফেলে রাখা হলো দীর্ঘ বছর ধরে। পুরনো প্রবেশদ্বার এখন বন্ধ পাকাপাকিভাবে। কিন্তু লোহার গ্রিলের তৈরি গেটটি বর্তমানে স্কুল সংলগ্ন রাস্তায় সাইড বাউন্ডারির বাইরে বছরের পর বছর ধরে অবহেলায় পড়ে আছে। সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ হলে গেটটি অন্য কোনো সরকারি বিদ্যালয়ে ব্যবহার করা যেত। অথচ খোয়াইয়ের বহু বিদ্যালয় এখনো গেটবিহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। তবুও দপ্তরের টনক নড়ছে না।
তাছাড়া অভিভাবকদের অভিযোগ পাহাড় সমান। বিদ্যালয়গুলিতে পর্যাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা নেই। যার ফলে খোয়াই সরকারী দ্বাদশ শ্রেণি বালিকা বিদ্যালয়ে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের একত্রে বসিয়ে ক্লাস নেওয়া হয়। এতে বড়ো ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে ছোটদের হাতাহাতি-মারামারি লেগেই থাকে। অভিযোগ জানালে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব এড়িয়ে যায়। নিয়মিত ক্লাসও হয় না বহু ক্ষেত্রে। কোন শিক্ষার্থী শৌচাগারে গেলে, বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে দেওয়া হয়। যেকারণে সম্প্রতি একটি ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ে। শিক্ষকদের এতটাই ব্যক্তিত্ব এই স্কুলে যে, শিক্ষার্থীরা বিপদে পড়লে শিক্ষকদের কিছু জানাতেও অনীহা। বাড়ী থেকে অভিভাবকদের ডেকে এনে সমস্যা জানায় শিক্ষার্থীরা। এই হচ্ছে শিক্ষাঙ্গনের অবস্থা।
এমন সব অভিযোগ শুধু একটি বিদ্যালয়ের নয়—খোয়াইয়ের বহু স্কুলে একই অব্যবস্থা। বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ না করেই ‘পিরিওডিক টেস্ট–২’ সম্পন্ন হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকেরা। তাদের মতে, বিদ্যালয় পরিদর্শক বিপেন কুমার দেববর্মার উদাসীনতা ও নিয়মিত পরিদর্শনের অভাবেই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষকদের সময়ানুবর্তিতা ও নিয়মানুবর্তিতা — কোনটাই নেই বলে অভিযোগ অভিভাবকদের।
আরও অভিযোগ, বিদ্যাজ্যোতি প্রকল্পের আওতায় ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলিতে সিবিএসই অনুমোদিত পাঠ্যবই পড়ানোর মতো প্রশিক্ষণ নেই অধিকাংশ শিক্ষকের। ফলে পাঠ্যবই-কেন্দ্রিক পঠন-পাঠনের ধারেকাছেও নেই স্কুলগুলি। উপরন্তু, নাম ইংরেজি মাধ্যম হলেও শিক্ষক-শিক্ষিকারা শুদ্ধ বাংলায় কথা বলেন না; ইংরেজিতে ক্লাস নেওয়া তো দূরের কথা।
একসাথে ১০,৩২৩ জন শিক্ষকের চাকুরীচ্যুতি এবং প্রতি বছর অবসরে যাওয়া শিক্ষকের সংখ্যার অনুপাতে দিন দিন রাজ্যের বিদ্যালয়গুলি ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। এতজন শিক্ষকের ঘাটতি পূরণে ব্যর্থতার দায় শিক্ষা দপ্তরের। এই সমস্যার সমাধান মানবিক চিন্তা-চেতনার মধ্যে লুকিয়ে আছে। আইন মেনে ১০৩২৩ জন শিক্ষককে চাকুরীতে বহাল করা গেলে, হয়তো রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার হাল অনেকটাই ফিরতে পারতো। কিন্তু রাজ্যের শিক্ষা দপ্তর ঠিক এর উল্টো পথেই হাঁটছে বলে অভিমত চাকুরীচ্যুত শিক্ষকদের।
সব মিলিয়ে খোয়াইয়ে শিক্ষা দপ্তরের কাজকর্ম এখন বেহাল দশায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এই অব্যবস্থার অবসান কবে হবে—সেটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*