গোপাল সিং, খোয়াই, ১৫ ডিসেম্বর || প্রায় ৭০-৭৫ বছর ধরে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলো তৎকালীন বাম শাসিত খোয়াই পুর পরিষদের সুনজরে আসেনি। বরং যাদের বাড়ি-ঘর আছে, তারাই পেয়েছিল বিভিন্ন কলোনীতে স্থান, পেয়েছিল সরকারীভাবে বাসস্থান। এমনকি বাংলাদেশীদের জন্যও জমি এবং গৃহের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভূমিহীন পরিবারগুলি থেকে যায় বঞ্চিত। তবে বর্তমানে খোয়াই পুর এলাকার সার্বিক বিকাশের আচ্ছাদনে এই বাসস্থানহীন পরিবারগুলোর ঠাঁই হবে কিনা তা সময়ই বলবে।
এদিকে জাতীয় স্তরে ‘প্রতিশ্রুতিশীল স্বচ্ছ শহর’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর খোয়াই পুর এলাকা এখন ধীরে ধীরে আধুনিক শহর রূপে আত্মপ্রকাশ করতে রূপরেখার ম্যাপে এগিয়ে চলছে। বর্তমান পুর পরিষদের চেয়ারপার্সন দেবাশীষ নাথশর্মার তদারকিতে শহরের পরিকাঠামো উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক পরিষেবায় একাধিক পরিকল্পিত পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হচ্ছে। মান্ধাতা আমলের নগর কাঠামো পেরিয়ে আধুনিক, পরিকল্পিত খোয়াই গড়ে তোলাই লক্ষ্য বলে পুর প্রশাসন সূত্রে খবর।
খোয়াইবাসীর মতে, শহরের রূপান্তরে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো পুরনো ও সরু রাস্তাগুলিকে প্রশস্ত করা। বিশেষ করে সুভাষপার্ক বাজার এলাকায় প্রতিদিনের যানজট বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বাজার এলাকাকে ‘নো-পার্কিং জোন’ ঘোষণা করে শহরের চার প্রান্তে পরিকল্পিত পার্কিং জোন তৈরি করা হোক। দীর্ঘদিন আগে অবৈজ্ঞানিক পরিকল্পনায় নির্মিত কোহিনুর মার্কেট ও তার আশপাশে পার্কিংয়ের নির্দিষ্ট ব্যবস্থা না থাকাই আজকের যানজটের মূল কারণ বলে মত সাধারণ মানুষের।
শহরের সৌন্দর্যায়ন ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে ইতিমধ্যেই পুর পরিষদ একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। মাইকিংয়ের মাধ্যমে নাগরিকদের সচেতন করা হচ্ছে, যাতে স্বচ্ছ শহরের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে। পাশাপাশি শিশুদের জন্য সাঁতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালুর দাবিও জোরালো হচ্ছে। মরানদী পাড় ও সুভাষপার্ক এলাকার পুকুরগুলিকে সংস্কার করে সাঁতার প্রশিক্ষণমূলক কাজে ব্যবহার করার প্রস্তাবও উঠেছে।
নাগরিক নিরাপত্তার স্বার্থে ডবল লেন রাস্তা ও ফুটপাত নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। বর্তমানে শহরের বহু ফুটপাত স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দখলে থাকায় পথচারীরা সমস্যায় পড়ছেন বলে অভিযোগ।
এদিকে উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে খোয়াই পুর পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলি ইতিমধ্যেই একাধিক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সম্প্রতি স্বচ্ছ সার্ভেক্ষণ ২০২৪–২৫-এর আওতায় ‘প্রতিশ্রুতিশীল স্বচ্ছ শহর’ হিসেবে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছে খোয়াই। নয়াদিল্লির বিজ্ঞান ভবনে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর উপস্থিতিতে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়।
ইতিমধ্যে শহরের সিওয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, রাস্তা সংস্কার, GIS প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্পত্তি ও নগর সম্পদের সার্ভে, পার্ক ও সেলফি পয়েন্টের সৌন্দর্যায়ন—সবকিছুই ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হচ্ছে। TUDA, PWD ও অন্যান্য দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ চলছে। আরও এক গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলো—ভারত সরকারের পক্ষ থেকে খোয়াই পুর পরিষদকে ‘মেন্টর সিটি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ত্রিপুরার আরও পাঁচটি পুরসভাকে স্বচ্ছতা ও নগর ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার দায়িত্ব পেয়েছে খোয়াই পুর পরিষদ।
পুর কর্তৃপক্ষের দাবি, এই সমস্ত উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো খোয়াইকে একটি পরিষ্কার, সবুজ, নিরাপদ ও আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলা—যেখানে নাগরিক পরিষেবা হবে উন্নত এবং জীবনযাত্রা হবে আরও স্বাচ্ছন্দ্যময়। এখন দেখার বিষয়, পরিকল্পনাগুলি কত দ্রুত ও কতটা কার্যকরভাবে বাস্তব রূপ পায়।
