মহাশিবরাত্রি ব্রত পালন বিধি

shআগরতলা, ২৪ ফেব্রুয়ারী ৷৷ আজ পবিত্র শিব চতুর্দশী তিথি। শ্রীশ্রী মহাশিবরাত্রি ব্রত পালন করা হয় আজকের এই দিনে। সূর্যের উত্তরায়ণের তিথি-নাক্ষত্রিক বিচারে সবচেয়ে পবিত্র দিন এটি। এই দিনের মাহাত্ম্য অনেক। রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণসমূহে শিবের সাধনা করতে মূলত পুরুষদেরকেই বেশি দেখা যায়। নারীরাও সমানভাবে শিবের উপাসনা করেছেন। কিন্তু সম্প্রতি শিবরাত্রিকে নারীদের একটা ব্রতে পরিণত করেছে বাঙালি পুরুষতান্ত্রিক হিন্দু সমাজ। তার পরিণতিও ভোগ করছে বাঙালি হিন্দুরা। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র, পরুশুরাম, শ্রীকৃষ্ণ, পঞ্চপাণ্ডব, রাবণ, ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্রসহ ঋষিগণ সকলেই ছিলেন শিবের উপাসক। শিবের উপাসনা করে শুধু দেবতা বা মানুষ নয়, অসুরেরাও বিভিন্ন সময় অর্জন করেছে প্রভূত ক্ষমতা। শিবের দৃষ্টিতে সবাই সমান। খুব অল্পেই সন্তুষ্ট হন শিব। আশুতেই (শীঘ্রই) সন্তুষ্ট হন বলে শিবের অপর নাম আশুতোষ। প্রকৃতপক্ষে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্যই এই পূজা মহাফল প্রদান করে থাকে।
 
মহাশিবরাত্রি বিহিত শিবপূজা: শিবরাত্রির আগের দিন সংযম পালন পূর্বক শুদ্ধাচারে নিরামিষ ভোজন করতে হয়। শিবরাত্রির দিন সকালে স্নান ও নিত্যপূজা করে উপবাস শুরু করতে হয়।
 
শিবরাত্রির পূজায় চার প্রহরে, চার প্রকার দ্রব্য দিয়ে স্নান করিয়ে চার প্রকার অর্ঘ্য প্রদান করে পৃথক পৃথক মন্ত্র উচ্চারণপূর্বক চারবার শিব পূজা করা বিধি। এতে অসমর্থ হলে একসাথে পরপর চারবার শিবপূজা করা যাবে। প্রথমে স্নানের দ্রব্য দিয়ে স্নান করিয়ে অর্ঘ্য নিবেদন করতে হবে। এরপর জল দিয়ে স্নান করাতে হবে।
 
যেকোন পূজা বা ব্রত পালনের শুরুতেই আচমন করতে হয়।
 
আচমন:
 
ডান হাতের তালু গোকর্ণাকৃতি করে সামান্য পরিমাণ জল নিয়ে ‘ওঁ বিষ্ণু’ মন্ত্রটি পাঠ করে পান করুন। এইভাবে মোট তিন বার জলপান করে আচমন করার পর হাত জোড় করে এই মন্ত্রটি পাঠ করুন—
 
ওঁ তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ
 
দিবীব চক্ষুরাততম্।
 
ওঁ অপবিত্রঃ পবিত্রো বা সর্বাবস্থাং গতোঽপি বা।
 
যঃ স্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষং স বাহ্যাভ্যন্তরঃ শুচিঃ।।
 
 
প্রথম প্রহরে পূজাবিধি:
 
দুধ দ্বারা স্নানের মন্ত্রঃ
 
ইদং স্নানীয় দুগ্ধং ওঁ হৌং ঈশানায় নমঃ
 
এই মন্ত্রটি বলে শিবকে দুধ দিয়ে স্নান করিয়ে একটি অর্ঘ্য হাতে নিয়ে নিম্নের মন্ত্রটি বলে অর্ঘ্য নিবেদন করতে হবে –
 
 
ওঁ শিবরাত্রি ব্রতং দেব পূজাজপপরায়নঃ
 
করোমি বিধিনবদ্দত্তং গ্রিহানার্ঘ্যং মহেশ্বর।
 
এরপর নিচের মন্ত্রটি বলে অর্ঘ্যটি শিবলিঙ্গের উপর দিতে হবে।
 
ইদম অর্ঘ্যং ওঁ নমঃ শিবায় নমঃ
 
অর্ঘ্য নিবেদনের পরে শিবকে জল দিয়ে স্নান করাতে হবে।
 
 
 
দ্বিতীয় প্রহরে পূজাবিধি:
 
দধি দ্বারা স্নানের মন্ত্রঃ
 
ইদং স্নানীয় দধিং ওঁ হৌং অঘোরায় নমঃ
 
বলে শিবকে স্নান করিয়ে একটি অর্ঘ্য হাতে নিয়ে-
 
ওঁ নম শিবায় শান্তায় সর্বপাপ হরায় চ।।
 
শিবরাত্রৌ দদাম্যর্ঘ্যং প্রসীদ উময়া সহ।।
 
এরপর নিচের মন্ত্রটি বলে অর্ঘ্যটি শিবলিঙ্গের উপর দিতে হবে।
 
ইদম অর্ঘ্যং ওঁ নমঃ শিবায় নমঃ
 
অর্ঘ্য নিবেদনের পরে শিবকে জল দিয়ে স্নান করাতে হবে।
 
 
 
তৃতীয় প্রহরে পূজাবিধি:
 
ঘৃত দ্বারা স্নানের মন্ত্রঃ
 
ইদং স্নানীয় ঘৃতং ওঁ হৌং বামদেবায় নমঃ
 
এই মন্ত্রটি বলে শিবকে ঘি দিয়ে স্নান করিয়ে একটি অর্ঘ্য হাতে নিয়ে নিম্নের মন্ত্রটি বলে অর্ঘ্য নিবেদন করতে হবে –
 
 
ওঁ দুঃখদারিদ্র্যশো কেন দগ্ধঽহং পার্বতীশ্বর।
 
শিবরাত্রৌ দদাম্যর্ঘ্যং উমাকান্ত প্রসীদ মে।।
 
 
এরপর নিচের মন্ত্রটি বলে অর্ঘ্যটি শিবলিঙ্গের উপর দিতে হবে।
 
ইদম অর্ঘ্যং ওঁ নমঃ শিবায় নমঃ
 
অর্ঘ্য নিবেদনের পরে শিবকে জল দিয়ে স্নান করাতে হবে।
 
 
 
চতুর্থ প্রহরে পূজাবিধি:
 
মধু দ্বারা স্নানের মন্ত্রঃ
 
ইদং স্নানীয় মধুং ওঁ হৌং সদ্যজাতায় নমঃ
 
এই মন্ত্রটি বলে শিবকে মধু দিয়ে স্নান করিয়ে একটি অর্ঘ্য হাতে নিয়ে নিম্নের মন্ত্রটি বলে অর্ঘ্য নিবেদন করতে হবে-
 
ওঁ ময়া কৃতান্যনেকানি পাপানি হর শঙ্কর।
 
শিবরাত্রৌ দদাম্যর্ঘ্যং উমাকান্ত গৃহান মে।।
 
এরপর নিচের মন্ত্রটি বলে অর্ঘ্যটি শিবলিঙ্গের উপর দিতে হবে।
 
ইদম অর্ঘ্যং ওঁ নমঃ শিবায় নমঃ
 
অর্ঘ্য নিবেদনের পরে শিবকে জল দিয়ে স্নান করাতে হবে।
 
 
চতুর্থ প্রহরের পূজা শেষ করে জোড় হাতে নিম্নলিখিত মন্ত্র পাঠ করতে হবে-
 
ওঁ অবিঘ্নেন ব্রত্নং দেব তত প্রসাদাৎ সমর্পিতম্
 
ক্ষমস্ব জগতাং নাথ ত্রৈলক্যাধিপতে হর।
 
জন্ময়াদ্য ক্রিতং পুণ্যং তদ্রুদ্রস্য নিবেদিতম্
 
তত প্রসাদান্মায়া দেব ব্রতমদ্য সমাপিতম্।
 
প্রসন্ন ভব মে শ্রীমন মদ্ভুক্তি প্রতিপাদ্যতাম
 
তদালোকেন মাত্রেন পবিত্রঽস্মি ন সংশয়।।
 
অতঃপর পূজা সমাপ্ত করে ব্রতকথা শ্রবণ করতে হবে।
 
 
 
পুষ্পাঞ্জলি:
 
সচন্দন পুষ্প ও বেলপাতা নিয়ে এই মন্ত্রে এক, তিন অথবা পাঁচ বার অঞ্জলি দেবেন—
 
 
ওঁ নমো শিবায় এষ সচন্দনপুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলি নমো শিবায় নমঃ।
 
 
 
শিবের প্রণাম মন্ত্র:
 
ওঁ নমঃ শিবায় শান্তায় কারণত্রয়হেতবে।
 
নিবেদয়ামি চাত্মানং গতিস্তং পরমেশ্বরম্।।
 
 
পারণ:
 
পরের দিন পারণ করতে হয়। পারণের সময় পঞ্জিকাতে দেয়া থাকে। এর মাঝে মহাদেবকে অন্ন নিবেদন করে পারণ মন্ত্র উচ্চারণপূর্বক উপোষ ভঙ্গ করতে হয়।
 
শিবরাত্রির পারণ মন্ত্র-
 
ওঁ সংসার ক্লেশদগ্ধস্য ব্রতেনানেন শঙ্কর
 
প্রসীদ সুমুখ নাথ জ্ঞান দৃষ্টিপ্রদ ভব।।
 
বিশেষ দ্রষ্টব্য- উপবাস থাকার দিনে তেলমাখা, দিবানিদ্রা, সহবাস, কোনোরূপ ভোগবিলাস, পাশা/জুয়া খেলা, নেশাবস্তু গ্রহণ সম্পূর্ন নিষিদ্ধ। পারণের দিন ২বার খাওয়া, সহবাস, পরিশ্রমের কাজ, দিবানিদ্রা, পরের অন্ন ভোজন, দূরপথে যাত্রা নিষেধ। বারবার জলপান করলে বা দিবানিদ্রা গেলে “ওঁ নমঃ নারায়ণায়”—এই মন্ত্র ১০৮ বার জপ করতে হয়। সম্পূর্ণ উপবাস না করতে পারলে জল, দুধ, ফল, মূল, ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। গুরু কিংবা ব্রাহ্মণের অনুমতি নিয়ে রাতে বা পূজার শেষে হবিষ্যান্ন খেলে ব্রতভঙ্গ দোষ হয়না।

 

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*