সুব্রত দাস, গন্ডাছড়া, ২৫ সেপ্টেম্বর || শারদীয় উৎসবের আনন্দে যখন রাজ্যের শহরাঞ্চল ঝলমলে হয়ে ওঠে, তখন গন্ডাছড়ার প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় নামে অদৃশ্য অন্ধকার। এখানকার গিরিবাসী উপজাতীয় পরিবারগুলি দারিদ্র্য ও কর্মহীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ থেকে শারদীয় পূজার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
শহরে বেসরকারি সংস্থা, এনজিও, ক্লাব এবং ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে পূজার সময়ে দান-ধ্যানের উৎসবমুখর পরিবেশ গড়ে ওঠে। হাজার হাজার নতুন বস্ত্র বিতরণ হয় দুঃস্থ পরিবারের হাতে। কিন্তু সেই আলোর ছটা গন্ডাছড়ার দুর্গম গ্রামগুলিতে পৌঁছায় না। ধলাই জেলার পাহাড়ি এই অঞ্চলে রাস্তাঘাটের অভাব এবং যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা সাহায্যের হাতকে বাধা দেয়। অধিকাংশ পরিবার উপজাতীয় সম্প্রদায়ভুক্ত—ত্রিপুরী, রিয়াং, চাকমা—যাদের জীবিকা নির্ভর করে জুম চাষ ও জঙ্গলের উপর। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে কাজের অভাব তাদের সংসার চালানোকে কঠিন করে তুলেছে। নতুন বস্ত্র কেনার সামর্থ্য না থাকায় অনেক পরিবার পূজায় পুরনো জামা পরে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য হন।
স্থানীয়দের বক্তব্য, “উৎসবের আনন্দ তো সবারই, কিন্তু আমাদের কাছে এটা দুঃখের স্মৃতি হয়ে যায়।” কয়েক বছর আগে গন্ডাছড়ার দলপতি এলাকায় নজিরবিহীন এক ঘটনা ঘটে। পূজার নতুন জামা না পেয়ে এক স্কুলপড়ুয়া ছাত্র সহপাঠীদের নতুন পোশাকে দেখে হীনমন্যতায় ভুগে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। যদিও চিকিৎসার মাধ্যমে তার জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়, কিন্তু ঘটনাটি গোটা অঞ্চলে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে।
রতননগর, ভগীরথ, দলপতি ও জগবন্ধু পাড়ায় স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে বহু পরিবার কাজের অভাবে দিশেহারা। জুম চাষে নির্ভরশীল তারা বর্ষা বা খরায় বিপর্যস্ত হন। রতননগরের এক গৃহিণী রিমা ত্রিপুরা বলেন, “সংসার চালানোই তো কষ্টকর, তার ওপর পূজার জামা কেনা আমাদের স্বপ্নের বাইরে।” ভগীরথ পাড়ার এক যুবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শহরের এনজিওরা এখানে আসে না। তারা বলে রাস্তা খারাপ। কিন্তু আমরা তো এখানেই থাকি, আমাদের পাশে দাঁড়ায় না কেন?”
দলপতি গ্রামের এক প্রবীণ অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, “পূজার বস্ত্র দান করলে শুধু নতুন জামা নয়, মানুষের মনে আনন্দও ফিরিয়ে আনা যায়।” তিনি জানান, বঞ্চিত হওয়ার ফলে অনেক পরিবারে পারিবারিক অশান্তি দেখা দিচ্ছে, যা শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
স্থানীয় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা মনে করছেন, এখনই সময় রাজ্যের এনজিও, ক্লাব এবং সচ্ছল ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার। মাত্র ৫০০-১০০০ পরিবারের জন্য বস্ত্র সংগ্রহ ও বিতরণ করা গেলে এই অন্ধকার দূর হতে পারে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলিকে দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে উৎসাহিত করতে হবে।
শারদীয় উৎসব শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, সমাজের সংহতির প্রতীক। গন্ডাছড়ার পাহাড়ি এলাকায়ও সেই সংহতির আলো পৌঁছানো জরুরি। যদি সবাই মিলে সাহায্যের হাত বাড়ান, তবে পূজার ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে এই গ্রামগুলোতেও বেজে উঠবে আনন্দের হাসি।
