কলকাতা, ৬ জানুয়ারী ।। সিগারেট ধরাতে সাধারণত আমরা দেশলাই কিংবা লাইটার ব্যবহার করি। কিন্তু তিনি সিগারেট জ্বালান বিদ্যুতের খুঁটিতে লাগানো ট্রান্সফর্মার থেকে। এরপর টানতে থাকেন বেশ আয়েশ করে।
পেশায় তিনি ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। বিদ্যুতের তারে লাইন আছে কীনা তা পরীক্ষা করতে তিনি টেস্টার ব্যবহার করেন না। জিভ দিয়ে পরখ করেই তিনি বুঝতে পারেন বিদ্যুতের লাইন আছে কিনা।
বনগাঁর প্রশান্ত বিশ্বাসের এমন উদ্ভট আচরণের আরোও একশ’ উদাহরণ রয়েছে পরিবার ও পড়শিদের কাছে। কলকাতায় এয়ার ইন্ডিয়ার সদর দপ্তরে হুমকি-ফোন করার অভিযোগে ৩৯ বছরের ওই যুবককে রবিবার রাতে বনগাঁর বাড়ি থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
সোমবার কলকাতার আদালতে তোলা হলে বিচারক তাকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত জেল-হাজতে রাখার নির্দেশ দেন। প্রশান্তের পাগলামির ঠেলায় মেয়েকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেছেন তার স্ত্রী। নিম্নবিত্ত পরিবার। বাবা মারা গেছেন আগেই। অন্যের বাড়িতে রান্নার কাজ করে সংসার চালান প্রশান্তের মা অনুরাধাদেবী।
তিনি গণমাধ্যমকে জানান, ছেলের মানসিক রোগের অনেক চিকিৎসা করিয়েছি। কিন্তু টাকার অভাবে চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। পুলিশ এখন তাকে ধরে নিয়ে গেছে। ভালোই হয়েছে, এখন পুলিশই ওর চিকিৎসা করাক।
একই দাবি বাড়ির অন্যদের। পড়শিদেরও। আইজি (কারা) অধীর শর্মা জানাচ্ছেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী যে-বন্দীই জেলে আসেন, তার প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়।
তিনি আরো জানান, এক্ষেত্রে যদি দেখা যায় যে, প্রশান্তের মানসিক অসুস্থতা রয়েছে এবং সেই চিকিৎসা জেল হাসপাতালে হবে না, তাহলে বড় সরকারি হাসপাতালে পাঠানো হবে।
প্রশান্তের পেশা হিসেবে পড়শিরা জানান, তিনি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সারানোর টুকিটাকি কাজ করা ইলেকট্রিশিয়ান। তার শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতি সম্পর্কে পড়শিরাই জানাচ্ছেন, বছর দশেক আগে ওই যুবকের একবার জ্বর হয়েছিল। তার পর থেকেই বনগাঁর কলমবাগানের বাসিন্দা প্রশান্তের মাথার অসুখ।
পড়শিরা আরো জানান, এ অবস্থা সব সময় যে ঘটে, তা নয়। প্রশান্ত যখন সুস্থ থাকেন তখন দিব্যি তিনি খোশমেজাজি। ছোটখাটো বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম মেরামতির কাজ দিব্যি করেন।
তারা জানান, মাঝেমধ্যে প্রশান্তর মাথা যখন বিগড়ে যায়, দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে এমন এমন কাণ্ড করে বসেন যার ব্যাখ্যা পান না কেউই।
পড়শিরা জানান, ঠিক যেমন দু’দিন আগে তিনি মোবাইল ফোন থেকে কলকাতায় এয়ার ইন্ডিয়ার সদর দফতরে ফোন করে বলেন, আপনাদের বিমান ছিনতাই করব। এমএইচ-৩৭০ (যে-মালয়েশীয় বিমান মাঝ-আকাশ থেকে রহস্যজনক ভাবে উধাও হয়ে গিয়েছে)-এর মতো।
পুলিশ জানায়, যেখানে তিনি ফোন করেছিলেন সেটি এয়ার ইন্ডিয়ার দফতর কিনা, সেই বিষয়েও নিশ্চিত ছিলেন না প্রশান্ত। বিমান ছিনতাইয়ের হুমকির জেরে তদন্তে নামে কলকাতা পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স।
তাদের অফিসারেরাই বনগাঁ থেকে ধরে আনেন প্রশান্তকে। কিন্তু রবিবার রাত থেকে জেরা করে তাদের মনে হয়, প্রশান্ত মানসিক ভারসাম্যহীন। ধৃত ব্যক্তি জঙ্গি নন, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে তাকে তুলে দেয়া হয় বৌবাজার থানার পুলিশের হাতে।
কিন্তু মানসিক ভাবে অসুস্থ প্রশান্ত জামিন পেলেন না কেন? এ ব্যাপারে পুলিশ অফিসারদের বক্তব্য, হতে পারে প্রশান্ত মানসিক ভাবে অসুস্থ। কিন্তু তার ওই ফোনের পরে যে-হুলস্থুল কাণ্ড হয়েছে, যে-আতঙ্ক ছড়িয়েছে, তার নিরিখেই তার জন্য সরাসরি জামিন চাওয়া সম্ভব নয়।
পুলিশ আরো জানান, প্রশান্তকে ভালো করে পরীক্ষা করানো দরকার। একমাত্র সেই পরীক্ষার পরেই জানা সম্ভব, প্রশান্ত সত্যিই মানসিক রোগি নাকি অভিনয় করছেন।
এ ব্যাপারে প্রশান্ত গণমাধ্যমকে মাথা নিচু করে জানান, ভুল হয়ে গেছে। -এবিপি
