শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই চরম সংকট: পাঠ্যবই অমিল, সিলেবাসে ভুরি ভুরি ভুল, দপ্তরের গাফিলতিতে ক্ষুব্ধ ছাত্র-শিক্ষক মহল

গোপাল সিং, খোয়াই, ১৭ জুন || সামনেই পিরিয়ডিক টেস্ট-১ পরীক্ষা, অথচ রাজ্যের ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে এখনও পৌঁছায়নি সব পাঠ্যপুস্তক। সিলেবাসেও রয়েছে ভুলের ছড়াছড়ি। একদিকে বইয়ের হাহাকার, অন্যদিকে সিলেবাসের গরমিল—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে চলতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই দিশেহারা বিদ্যাজ্যোতি এবং বাংলা মাধ্যমের পড়ুয়ারা। শিক্ষা দপ্তরের এই চরম উদাসীনতায় ক্ষোভে ফুঁসছে অভিভাবক এবং শিক্ষক মহল।
নিয়ম অনুযায়ী, আগামী জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে রাজ্যের প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রথম পিরিয়ডিক টেস্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু গ্রীষ্মের ছুটির আগে হাতে গোনা কিছু বই দেওয়া হলেও, স্কুল খোলার পরেও পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি হয়নি। খোয়াই জেলার গ্রামীণ এবং এডিসি এলাকাগুলিতে এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

পাঠ্যপুস্তক ও সিলেবাসে ভুলের ছড়াছড়ি:
অভিযোগ শুধু বই না পাওয়া নিয়েই নয়, এসসিইআরটি (SCERT) প্রদত্ত সিলেবাস এবং পাঠ্যবইয়ের মধ্যেও রয়েছে বিস্তর অসঙ্গতি।

বিষয়বস্তুর অমিল: চতুর্থ শ্রেণির ইংরেজি পাঠ্যবইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ের নাম ‘A Trip to Bhopal’ হলেও, সিলেবাসে সেটিকে ‘A Trip to Udaipur’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভাষাগত বিভ্রান্তি: বিদ্যাজ্যোতি (ইংরেজি মাধ্যম) এবং বাংলা মাধ্যম—উভয় ক্ষেত্রেই গণিতের যে ওয়ার্কবুক দেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ বাংলায় মুদ্রিত। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাংলা সংখ্যার মধ্যে ইংরেজি সংখ্যা ব্যবহার করে ছাত্র-ছাত্রীদের আরও বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। পঞ্চম শ্রেণির বিদ্যাজ্যোতি ওয়ার্কবুকেও একাধিক ভুল স্পষ্ট, যা নিয়ে অভিভাবক মহলে তীব্র গুঞ্জন শুরু হয়েছে।

প্রশাসনের ব্যর্থতা এবং ১০৩২৩ প্রসঙ্গে চাকুরীচ্যুত শিক্ষকদের একাংশের মতে, এই সংকট শিক্ষা দপ্তরের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক খামখেয়ালিপনারই প্রতিফলন। অনেকেই এই পরিস্থিতির জন্য দপ্তরের সেই একই গাফিলতিকে দায়ী করছেন, যার শিকার হয়েছিলেন ১০,৩২৩ জন শিক্ষক। চাকরিচ্যুত শিক্ষকদের দাবি, তাঁদের নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং চাকুরীচ্যুতির পিছনেও ছিল দপ্তরের চরম ত্রুটি। তাঁদের যুক্তির মধ্যে রয়েছে-

১| সুপ্রিম কোর্টের কোনও রায়পত্রে নির্দিষ্টভাবে ১০,৩২৩ জন শিক্ষকের চাকরি বাতিল করার কথা উল্লেখ নেই। তাঁদের কাছে এই দাবির স্বপক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আরটিআই (RTI) কপিও রয়েছে।

২| তাঁরা ‘তন্ময় নাথ বনাম রাজ্য সরকার’ মামলার পক্ষভুক্ত ছিলেন না।

৩| যে ২০০৩ সালের নিয়োগ নীতি আদালত বাতিল করেছিল, সেই নীতিতে তাঁদের নিয়োগ হয়নি। বরং ১৯৭১ সালের নীতি অনুযায়ী তাঁদের নিয়োগ হয়েছিল।

৪| ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকদের আরও দাবি, মূল রায়ের ১২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা ছিল যে, যে নিয়োগগুলি হয়ে গিয়েছে সেগুলিতে হস্তক্ষেপ না করে নতুন নীতি তৈরি করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। তাঁদের মতে, শিক্ষা দপ্তরের ভুলের কারণেই আজ রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা ধুঁকছে এবং হাজার হাজার শিক্ষকের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।

সব মিলিয়ে, পাঠ্যপুস্তকের সংকট থেকে শুরু করে শিক্ষকদের বঞ্চনা—শিক্ষা দপ্তরের লাগাতার ব্যর্থতায় রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে, এমনটাই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। সব মিলিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ মানিক সাহা, যিনি শিক্ষা দপ্তরেরও মন্ত্রী, তিনি শিক্ষা দপ্তরের আমলাদের গভীর চক্রান্তের ফাঁদে পড়ে যাচ্ছেন বলেও অভিমত ব্যক্ত করেছেন চাকুরীচ্যুত শিক্ষকরা।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*