গোপাল সিং, খোয়াই, ১২ মার্চ || আজ সমাজ লজ্জিত। সমাজের মেরুদণ্ডরা লজ্জিত। ছাত্র ও শিক্ষক সমাজ লজ্জিত। কিন্তু আজ যারা এক নিরীহ শিক্ষকের উপর বিনাদোষে চড়াও হলেন, তারা লজ্জায় মুখ লুকাবেন কি করে? প্রশ্ন শুভবুদ্ধি মহলের।
খোয়াই জেলার বাইজালবাড়ি এলাকায় এক শিক্ষককে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে বাইজালবাড়ী থানাধীন মুদিবাড়ী রাংখরবাড়ি নিম্ন বুনিয়াদী বিদ্যালয়ের সামনে। আহত শিক্ষক হলেন বিশ্বজিৎ রায়, যিনি বর্তমানে বাইজালবাড়ি এলাকার একটি বিদ্যালয়ে কর্মরত এবং পূর্বে রতনপুর দ্বাদশ বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করতেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন শিক্ষক বিশ্বজিৎ রায় তাঁর স্ত্রীকে মহারাজা বীর বিক্রম বিমানবন্দর-এ নামিয়ে দিয়ে খোয়াইয়ের দিকে ফিরছিলেন। তাঁর স্ত্রী কলকাতার উদ্দেশ্যে যাবার কথা। পরে এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হতেই তিনিও ফ্লাইটে না ওঠে ফিরে আসেন।
এদিকে বিশ্বজিৎ রায় খোয়াইয়ে ফেরার পথে বাইজালবাড়ি থানাধীন মুদিবাড়ি বিদ্যালয়ের সামনে একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রী তাকে অনুরোধ করে খোয়াই পর্যন্ত গাড়িতে তুলে দেওয়ার জন্য। উনারই ছাত্রী সে। ঠিক সেই সময় ছাত্রীটি গাড়িতে ওঠার মুহূর্তে স্থানীয় কয়েকজন নারী-পুরুষ ঘটনাস্থলে এসে শিক্ষককে নানা অভিযোগ তুলে গাড়ি থেকে টেনে নামিয়ে স্কুল মাঠে নিয়ে যায় এবং মারধর শুরু করে বলে অভিযোগ। ছাত্রীটি ঘটনাটির প্রকৃত ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকেও মারধর করা হয় বলে পুলিশকে দেওয়া বয়ানে উল্লেখ করেছে সে।
ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে বাইজালবাড়ি থানা-র পুলিশ। থানার ওসি যুগল ত্রিপুরা জানান, সময়মতো পুলিশ না পৌঁছালে শিক্ষক ও ছাত্রীর উপর আরও গুরুতর হামলা হতে পারত। পুলিশ জানায়, শিক্ষক ও ছাত্রীর চিকিৎসার জন্য মেডিক্যাল পরীক্ষা করানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত শিক্ষক বিশ্বজিৎ রায় কিংবা ছাত্রীর পরিবার কারোর পক্ষ থেকেই কোনও লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।
এদিকে ঘটনার একটি ভিডিও ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষক সমাজ ও সচেতন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, একজন শিক্ষক তাঁর ছাত্রীকে গাড়িতে তুললে তা নিয়ে কেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো এবং ঘটনার পেছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা নিয়েও নানা মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তাছাড়া শিক্ষক বিশ্বজিৎ রায় তাঁর মহানুভবতা দেখিয়ে কারোর বিরুদ্ধেই কোনো মামলা এখনও করেননি। ছাত্রী ও শিক্ষকের মেডিক্যাল করানোর পর তারা চলে যায়। না শিক্ষক, না ছাত্রীর অভিভাবক, কারোরই কোনো অভিযোগ একে অপরের বিরুদ্ধে নেই। কিন্তু রাজ্যের আইন, শিক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী কিংবা শিক্ষক সমাজ কি এর সুবিচার চাইবে না। এভাবেই অশিক্ষার অন্ধকারে বেড়ে উঠবে শিক্ষকের উপর হামলা ও হেনস্থা করার প্রবণতা। সমাজের শিক্ষিত মানুষ এবং আজ যারা শিক্ষক হতে চেয়ে পড়াশোনা করছে, তাদের কাছে কি বার্তা যাচ্ছে। এরকম চলতে থাকলে আগামীদিনে কেউ কি শিক্ষকতার পেশায় আসতে চাইবে? ছাত্র সমাজে কি সঠিক বার্তা বইছে? গোটা ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হবার পরও দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তির বিধান কি নেই? শিক্ষক যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়ে থাকে তবে কি এর সুষ্ঠু বিচার হবে? প্রশ্ন শুভবুদ্ধি মহলের।
