দেউলিয়া গ্রিস, পালাচ্ছে তরুণেরা

nvnআন্তর্জাতিক ডেস্ক ।। ঋণে ইউরোজোনের দাতা দেশগুলোর কঠিন শর্তে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটের উন্নত দেশ হয়েও দেউলিয়া হওয়ার পথে গ্রিস। এমন অবস্থায় দেশটির তরুণ প্রজন্ম চরম হতাশ হয়ে পড়েছে। ২১ বছরের তরতাজা তরুণ দানি আইয়োরদা বলছে, গ্রিসে আমি কোনো ভবিষ্যৎ দেখি না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এই তরুণের কণ্ঠেই হতাশা আঁচ করা যায়। মা ফি দিতে পারেন না। তাই পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। দানি স্বীকার করেন, তাঁর দেশটা সত্যিই সুন্দর। কিন্তু এখানে দিনের পর দিন সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার কথা তিনি কল্পনাও করতে পারেন না। এমন অবস্থা কেবল দানির নয়, তাঁর মতো দেশ ভরা সব তরুণ-তরুণীর। নিদারুণ অর্থ-সংকটের কারণে গ্রিস এখন কপর্দকহীন রাষ্ট্র। ঘরে-বাইরে সবখানে হাঁ মেলে আছে অভাব। চাকরি-চাকরি নেই, খাবারের অভাব। কারও কাছে কোনো কিছু কেনার মতো অর্থ নেই। আবার অর্থ থাকলেও এর সংস্থান নেই। কারণ ব্যাংক বন্ধ। এমন ঘোরতর সংকটের সমাধান কী? উত্তর একটাই—গ্রিস ছাড়ো। স্বেচ্ছা নির্বাসনে যাও। সেটাই করছে এখন গ্রিক তরুণ-তরুণী। দলে দলে দেশ ছাড়ছে তারা। মানব সভ্যতার ধারক ও বাহক গ্রিসে এখন যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে বেকারত্ব প্রায় ৫০ শতাংশ। ২০১০ সালে অর্থনৈতিক সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত দুই লক্ষাধিক তরুণ-তরুণী দেশ ছেড়েছে। হাতে গোনা যে কয়জনের কপালে চাকরি জুটছে, বেতন মোটেও ভালো নয়। মেধার কোনো মূল্যায়ন নেই। দুর্নীত দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এমন পরিস্থিতিতে দানি আইয়োরদাকের মতো তরুণেরা দেশ ছাড়বে না তো আঙুল চুষবে? এমন এক তরুণ ক্রিসতোস পেনোজ। বিজ্ঞানে গবেষণা ও কাজের সুযোগের অভাব থাকায় ২০১৩ সালে তিনি গ্রিস ছেড়ে যান। এখন নরওয়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে কাজ করছেন ৩২ বছরের এই তরুণ। পেনোজ বলেন, বন্ধুরা একে একে সবাই গ্রিস ছেড়েছেন। ভাই থাকেন স্পেনে। বন্ধুদের অনেকে থাকেন জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও পোল্যান্ডে। প্রথমে পেনোজ ভেবেছিলেন দুই বা তিন বছর পর গ্রিসে ফিরে যাবেন। কিন্তু গ্রিসের অর্থনৈতিক অবস্থা এখন আরও খারাপ। গ্রিসের সূর্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও খাবারের কথা মনে পড়লে মনটা খারাপ হয়ে যায় পেনোজের। তবু তিনি গ্রিসে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। কারণ সেখানে ভবিষ্যৎ একেবারে অনিশ্চিত। পর দিন গ্রিসের পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠছে। রাস্তার ধারে একটি বেঞ্চে স্যান্ডউইচ খেতে খেতে পা ঝুলিয়ে বসে ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছিলেন দুই বন্ধু মেরিলেনা ও জোসি। জোসি একজন ফিজিওথেরাপিস্ট। কিন্তু তিনি পূর্ণকালীন কোনো কাজ পাচ্ছেন না। অর্থ উপার্জনের জন্য তাকে শিশুদের পরিচর্যা ও পরিচ্ছন্নতার কাজও করতে হয়। গ্রিসের এই আর্থিক সংকট শুরুর আগে এসব করে জোসি পেতেন এক হাজার ৪৪০ ডলার। এখন তার অর্ধেকও পান না। জোসির বন্ধু সিরিয়া থেকে আসা একজন অভিবাসন-প্রত্যাশী। বন্ধুটি এখন নেদারল্যান্ডসে থাকেন। জোসি ভাবছেন, সেখানেই চলে যাবেন। মেরিলেনাও জার্মানিতে তাঁর ভাইয়ের কাছে চলে যাবেন বলে ভাবছেন। ভাই জার্মান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। সেখানে তাঁর বেতন দুই হাজার ইউরো। প্রকৌশলী জানিস গ্রিগোরিওর হাতে কাজ নেই কয়েক বছর ধরেই। তিনি আরবে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। সেখানে তিনি ভালো কাজ পাবেন বলে আশা করছেন। জানিস বলেন, পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ। যদি পাঁচ বছর আগে তিনি এ রকম হবে বলে জানতেন, তাহলে একজন পরিচারক বা চুল পরিচর্যাকারী হওয়ার কথা ভাবতেন। কারণ গ্রিসে এরাই অন্যদের চেয়ে ভালো আছে। গ্রিসের থেসালনিকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক লুই ল্যাবরিয়ানিদিস বলেন, সংকটের কারণে তরুণেরা এখন গ্রিস ছেড়ে পালাচ্ছেন। তবে লুই অন্য সবার মতো হতাশ নয়। তিনি গ্রিসে বিনিয়োগ বাড়াতে চান। শিল্প গড়ে তুলতে চান। এ জন্য সরকারের সহযোগিতাও চান। অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে গ্রিস। আইএমএফের কাছ থেকে নেওয়া গ্রিসের দেড় বিলিয়ন ইউরো (১ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) গত মঙ্গলবারের মধ্যে শোধ করার কথা থাকলেও তা পারেনি গ্রিস। এতে ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে তারা। গ্রিসকে তার ব্যাংকগুলো এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ করে দিয়ে পুঁজি নিয়ন্ত্রণের পথ ধরতে হয়েছে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সম্ভাব্য একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। এই চুক্তির জন্য দাতারা যে প্রস্তাব দিয়েছে, এতে বিভিন্ন খাতে ব্যয়-সংকোচন করার কথা বলা আছে। এতে আপত্তি রয়েছে দেশটির বর্তমান বামপন্থী সরকারের। তবে চুক্তি না হলে গ্রিস এসব দাতার কাছ থেকে কাক্সিক্ষত ২৯ বিলিয়ন ইউরো ঋণ পাবে না। এই ঋণ পেলেই কেবল এথেন্স আগামী দুই বছরের মধ্যে পরিশোধযোগ্য সব দেনা শোধ দিতে পারবে।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*