সুব্রত দাস, গন্ডাছড়া, ০৯ ফেব্রুয়ারী || ত্রিপুরার রাজনীতিতে দলবদলের নাটক যে এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়মে পরিণত হয়েছে—তার আরও এক জ্বলন্ত উদাহরণ তৈরি করলেন রাইমাভ্যালি বিজেপি মণ্ডলের সহ-সভাপতি মধু কুমার ত্রিপুরা। রবিবার ঢাকঢোল পিটিয়ে বিজেপির শরিক দল তিপ্রা মথায় যোগদান করলেও, সোমবার সকাল হতেই সেই সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ ইউ-টার্ন নিলেন তিনি। ২৪ ঘণ্টাও টিকল না তাঁর তথাকথিত ‘রাজনৈতিক অবস্থান’।
এই দ্রুত পাল্টি খাওয়া দলবদল শুধু রাইমাভ্যালি নয়, গোটা ত্রিপুরার রাজনৈতিক মহলে রীতিমতো হাস্যরসের পাশাপাশি ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
সোমবার রাইমাভ্যালিতে মণ্ডল সভাপতি ও বিজেপির অন্যান্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে মধু কুমার ত্রিপুরা পুনরায় বিজেপির পতাকা হাতে তুলে নেন। সেখানেই তিনি দাবি করেন, কোনো মতপার্থক্যের কারণে নয়, বরং তিপ্রা মথার “আসল রূপ” ও “ভিতরের চালচিত্র” বুঝতেই নাকি তিনি মাত্র ২৪ ঘণ্টার জন্য ওই দলে যোগ দিয়েছিলেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিপ্রা মথার অন্দরমহলে নাকি শৃঙ্খলার ঘাটতি রয়েছে এবং সেখানে মানুষের সম্মানের চেয়ে বিশৃঙ্খলাই বেশি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, আদর্শগতভাবে তিনি বিজেপিতেই বিশ্বাসী এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ মানিক সাহার উন্নয়নমূলক রাজনীতির প্রতি তিনি অনুগত।
তবে এই বক্তব্য ঘিরে একাধিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যে দলকে তিনি আজ ‘অশৃঙ্খল’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন, সেখানে যোগ দেওয়ার আগে কি সেই বাস্তবতা তাঁর অজানা ছিল? নাকি এটি নিছকই রাজনৈতিক সুবিধাবাদের আরেক নাম—এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক মহলে।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, তিপ্রা মথায় যোগ দেওয়ার সময় নিজের মুখেই তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে, রাইমাভ্যালির বিজেপির একাধিক নেতা নাকি কোটিপতি হয়ে গেছেন। সেই অভিযোগ তোলার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আবার একই দলে ফিরে আসা সাধারণ মানুষের চোখে চরম দ্বিচারিতা বলেই ধরা পড়েছে।
এদিকে এই ঘটনায় বিজেপির অন্দরেও স্বস্তির বদলে অস্বস্তি বাড়ছে। দলের সমর্থকদের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন—যাঁর সক্রিয় সদস্যপদ ও রাজনৈতিক অবস্থানই যদি এতটা অনিশ্চিত হয়, তাহলে কীভাবে তাঁকে রাইমাভ্যালি মণ্ডল কমিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনে সহ-সভাপতির পদ দেওয়া হয়েছিল?
দলের অন্দরমহলে ইতিমধ্যেই জোর আলোচনা শুরু হয়েছে—এই নাটকীয় দলবদলের পর মধু কুমার ত্রিপুরাকে আগের পদে বহাল রাখা হবে, নাকি সাংগঠনিক নিয়ম মেনে পুরো মণ্ডল কমিটিই ভেঙে নতুন করে গঠন করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাইমাভ্যালির এই ঘটনা আসলে ত্রিপুরার বর্তমান রাজনীতির নগ্ন চেহারাটাই তুলে ধরেছে। তাঁদের মতে, রাজ্যের রাজনীতি এখন যেন ‘২৪ ঘণ্টার যাত্রীখানা’। কখনো তিপ্রা মথার নেতা বিজেপিতে ঢুকছেন, আবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ফিরে যাচ্ছেন পুরনো দলে। আবার কখনো বিজেপির নেতা তিপ্রা মথায় যোগ দিচ্ছেন, কিন্তু রাত পোহানোর আগেই আবার বিজেপিতে হাজির হচ্ছেন। আদর্শের নামে এই লুকোচুরি আসলে জনগণের সঙ্গে ঠাট্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।
রাইমাভ্যালির সচেতন মহলের অভিমত, এই ২৪ ঘণ্টার দলবদল কোনো একক ব্যক্তির সিদ্ধান্তমাত্র নয়, বরং রাজ্যের রাজনীতিতে আদর্শহীনতা, সুযোগসন্ধানী মানসিকতা ও সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় তীব্র আলোচনা, সমালোচনা ও ক্ষোভের ঝড় উঠেছে। এখন দেখার বিষয়, এই নাটকের পর রাজনৈতিক দলগুলি আদৌ আত্মসমালোচনার পথে হাঁটে কি না।
