নির্ধারিত সময়ের বহু আগেই বার্ষিক পরীক্ষার হুলিয়া জারি শিক্ষা দপ্তরের! মানছে না CBSE নির্দেশিকা, সঙ্কটে গোটা রাজ্যের শিক্ষার্থীরা!

গোপাল সিং, খোয়াই, ৩০ নভেম্বর || আজকের শিশু, আগামীদিনের ভবিষ্যত। কিন্তু একের পর এক তুঘলকি সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত নিয়েই ছিনিমিনি খেলা শুরু করেছে রাজ্যের তথাকথিত শিক্ষাদপ্তর। নির্ধারিত সময়ের এক মাস আগেই জোরজবরদস্তি বার্ষিক পরীক্ষা গ্রহণের নির্দেশ জারি করেছে রাজ্যের শিক্ষা দপ্তর। অথচ কেন্দ্রীয় সিবিএসই গাইডলাইন অনুযায়ী বার্ষিক পরীক্ষা আয়োজন হওয়ার কথা ছিল ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ অথবা মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে।
তৎকালীন আমলের শিক্ষা দপ্তরের আমলারা কি মুখ্যমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরকে কালিমালিপ্ত করতে মরিয়া? রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে কুপরামর্শ দিয়ে ১০৩২৩ জন শিক্ষককে চাকুরীচ্যুত করা হয়েছে বলে শিক্ষা দপ্তরের বিরুদ্ধে সম্প্রতি চাকুরীচ্যুত শিক্ষকদের একাংশ দাবি করেছেন। বর্তমানে সিবিএসই গাইডলাইনকে চূড়ান্ত অবমাননা করে, মর্জিমাফিক সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজ্যের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে খেলছে শিক্ষা দপ্তর, অভিযোগ খোদ অভিভাবকদের।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, এখনো বহু স্কুলে ষান্মাসিক (টার্ম-ওয়ান) পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। শিক্ষার্থীরা কত নম্বর পেয়েছে— তা জানানো হয়নি অভিভাবকদের। এর মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে ‘পিরিওডিক টেস্ট-টু’, যা সিবিএসই নিয়ম অনুযায়ী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে হওয়ার কথা। পরীক্ষার পাশাপাশি সিলেবাসেও রয়েছে প্রচুর অধ্যায়। শিক্ষার্থীরা কার্যত মাত্র দুই মাস সময় পেয়েছে। পরবর্তী বার্ষিক পরীক্ষার আগে তাদের হাতে সময় থাকবে মাত্র এক মাস। শিক্ষা দপ্তরের এই তুঘলকি সিদ্ধান্তে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন রাজ্যের অভিভাবকরা।
ত্রিপুরার শিক্ষা দপ্তরের আচরণ আজ রাজ্যবাসীকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বিদ্যাজ্যোতি প্রকল্পভুক্ত ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোতে এনসিইআরটি ও সিবিএসই–র নির্দেশিকা উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত চারটি পরীক্ষার সময়সূচি মানা হচ্ছে না। সংবাদমাধ্যমে বারবার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরও শিক্ষা দপ্তর নির্বিকার। মুখ্যমন্ত্রী, যিনি আবার শিক্ষা দপ্তরের মন্ত্রীও, তিনি কেন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না— এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে অভিভাবক মহলে। এদিকে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের সংশোধিত সিলেবাস এখনো এসসিইআরটি–র ওয়েবসাইটে আপলোড হয়নি।
শিক্ষক–ছাত্র অনুপাত এ রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংকট তুলে ধরে। বহু বিষয়ে নিয়মিত পাঠদান হয় না। কোনো কোনো শিক্ষক স্কুলে উপস্থিত হন না। আবার কোথাও বনেদী স্কুলেই একসঙ্গে কয়েকটি ক্লাসকে একত্র করে পড়াতে হচ্ছে। অনেক বিদ্যাজ্যোতি অনুমোদিত ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে শিক্ষক নেই বললেই চলে। ফলে একদিকে শিক্ষক আধিক্য, অন্যদিকে তীব্র শিক্ষক সংকট— এই বৈষম্যকে শিক্ষা দপ্তরের পরিকল্পনাহীনতার ফল বলেই মনে করছেন অভিভাবকরা।
বিদ্যাজ্যোতি প্রকল্প চালুর পর একসময় আশার আলো দেখা গেলেও, পর্যাপ্ত শিক্ষক, অবকাঠামো ও গুণগত শিক্ষার অভাবে প্রকল্পটি এখন প্রায় কাগুজে রূপ নিয়েছে। দপ্তরের একাংশের মতে, পর্যাপ্ত যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ও আধুনিক পরিকাঠামো তৈরি হলে তবেই প্রকল্পের আসল সুফল মিলবে। অথচ অভিভাবকদের অভিযোগ— নিয়মিত ক্লাস হয় না, শিক্ষকরা অনিয়মিত, পরীক্ষার ফল প্রকাশে দেরি— কিন্তু এর কোনো দায় নিচ্ছে না শিক্ষা দপ্তর।
শিক্ষক সংকটের জেরে রাজ্যের শিক্ষা দপ্তরের সিদ্ধান্তগ্রহণ ক্ষমতা ভেঙে পড়েছে বলেই মনে করছেন অনেকে। এর মধ্যেই রাজ্যের বহু অভিজ্ঞ শিক্ষক চাকরি হারালেও শিক্ষা দপ্তর বা রাজ্য সরকার— কেউই শিক্ষাব্যবস্থা বাঁচাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। চাকুরিচ্যুত ১০৩২৩ শিক্ষকদের মতে, আইন মেনে তাদের ব্যবহার করলে শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট অনেকটাই লাঘব করা যেত। কিন্তু শিক্ষা দপ্তরের কি সত্যিই ইচ্ছা আছে রাজ্যের স্কুলগুলোর দুরবস্থা দূর করার? শিক্ষক সংকট সমাধানের?
শিক্ষা, প্রশাসন ও রাজনীতির সমন্বয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার ভিত গড়ে ওঠে। ত্রিপুরার শিক্ষা দপ্তরের বর্তমান সিদ্ধান্ত এবং কর্মপদ্ধতি সেই ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*