শব্দের তুলিতে আঁকা এক পঁচিশের কোলাজ: ‘আজকের ভাষা’র রজত জয়ন্তী বর্ষে ৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে স্বর্গীয় ধীরেন্দ্র নাথশর্মা স্মৃতি সম্মাননা প্রদান ও কবি সম্মেলন

গোপাল সিং, খোয়াই, ০৫ এপ্রিল || সাহিত্যের আঙিনায় পঁচিশটি বসন্ত পার করা কেবল সময়ের পরিক্রমা নয়, বরং এক নিরবচ্ছিন্ন সৃজনশীল সাধনার জয়যাত্রা। সেই ঋদ্ধ পথচলার রজত জয়ন্তী বর্ষে খোয়াইয়ের মাটি সাক্ষী থাকল এক অনন্য মননশীল সন্ধ্যার। কবি দীপেন নাথশর্মার সুযোগ্য সম্পাদনায় প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা ‘আজকের ভাষা’-র ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল সম্মাননা, আলোচনা এবং কবিতার নিবিড় আবেগ।
অনুষ্ঠানের অন্যতম উজ্জ্বল মুহূর্ত ছিল স্বর্গীয় ধীরেন্দ্র নাথশর্মা স্মৃতি সম্মাননা-২০২৬ প্রদান। সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পাঁচজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের হাতে এই সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। সম্মাননা প্রাপকদের তালিকায় ছিলেন খোয়াই পুর পরিষদের চেয়ারপার্সন দেবাশীষ নাথশর্মা, বরিষ্ঠ সাংবাদিক গোপাল সিং, বিশিষ্ট সমাজসেবী ও লেখক বিনয় দেববর্মা, খোয়াই জিলা পরিষদের কর্ম বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সদস্য অনুকুল দাস এবং ত্রিপুরা বক্সিং এসোসিয়েশনের রাজ্য সভাপতি অভিজিৎ দত্ত ভৌমিক। স্মারক ও গ্রন্থ বিনিময়ের মাধ্যমে সৃজনশীলতার এই মিলনমেলা এক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে রূপ নেয়।
আলোচনা পর্বে উঠে আসে সাহিত্যের সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা। প্রধান অতিথির ভাষণে দেবাশীষ নাথশর্মা স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের অগ্নিঝরা দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, “সুকান্ত কিংবা নজরুলের লেখনী যেভাবে দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, আজও বর্তমান সময়ের নিরিখে সেই বাস্তবমুখী প্রাসঙ্গিকতা কবিদের কলমে ফুটে ওঠা প্রয়োজন।” সমাজকে সচেতন করতে, বিশেষ করে মরণনেশার বিরুদ্ধে সৃজনশীল লেখনীকে হাতিয়ার করার জন্য তিনি কবিদের প্রতি আহ্বান জানান।
একই সুরে খোয়াই জিলা পরিষদের কর্ম বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সদস্য অনুকুল দাস বলেন, কবিতার শক্তি অপরিসীম। অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা কাটিয়ে কবিদের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারও করেন তিনি। অন্যদিকে, ‘নিহারীকা প্রকাশনী’র কর্ণধার তীর্থঙ্কর দাস দাবি তোলেন খোয়াইয়ের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দেওয়ার। তিনি স্থানীয় শিল্প-সাহিত্য কর্মীদের পাশে থাকার জন্য সুধীজনদের বিশেষ অনুরোধ জানান।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয়ার্ধে ‘আজকের ভাষা’ ও ‘ত্রিধারা’ সাহিত্যপত্রের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত স্বরচিত কবিতা পাঠের আসরটি ছিল অভাবনীয় আবেগঘন। নাথশর্ম্মা এবং ‘ত্রিধারা’ সাহিত্যপত্রের সম্পাদক, নবীন কবি অনিমেষ ঋষিদাস ও সভাপতি হলেন সাংবাদিক ও কবি যশপাল সিং। গোটা অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নবীন কবি সৌর প্রতিম শর্ম্মা। প্রায় কুড়িজন কবি তাঁদের কলমের জাদুতে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এদিন অধিকাংশ কবির লেখনী ও কণ্ঠে ফুটে ওঠে পিতৃবিয়োগের হাহাকার ও না বলা দীর্ঘশ্বাস। একে একে কবিরা যখন তাঁদের ব্যক্তিগত শোককে শব্দের বুননে সার্বজনীন করে তুলছিলেন, তখন সমগ্র সভাগৃহে এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা নেমে আসে। একে অপরের আবেগে সম্পৃক্ত হয়ে এই আসরটি কেবল পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, হয়ে উঠেছিল প্রাণের স্পন্দন। উপস্থিত সাহিত্য অনুরাগীদের মতে, শোক আর শিল্প যেখানে এক বিন্দুতে মিলিত হয়, সেখানেই কবিতার প্রকৃত জয়।
এদিনের মঞ্চ অলঙ্কৃত করেছিলেন স্বর্গীয় ধীরেন্দ্র নাথশর্মার অর্ধাঙ্গিনী গীতা নাথশর্মা, প্রবীণ কবি নিবারণ নাথ, মধুমঙ্গল সিনহা, প্রাক্তন শিক্ষক প্রিয়তোষ ঘোষ সহ আরও অনেকে। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সুচারুভাবে সঞ্চালনা করেন নবীন কবি সৌরপ্রতিম শর্মা।
পিতার স্মৃতিকে পাথেয় করে দীপেন নাথশর্মার এই সাহিত্যিক উদ্যোগ ও চিন্তন খোয়াইয়ের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে আগামী দিনে আরও বহুদূর নিয়ে যাবে— অনুষ্ঠানের শেষে এটাই ছিল উপস্থিত গুণীজনদের সম্মিলিত অভিমত। ‘আজকের ভাষা’ কেবল একটি পত্রিকা হয়ে থাকেনি, বরং হয়ে উঠেছে এক বিশাল সাহিত্যিক পরিবারের আশ্রয়স্থল।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*