ত্রিপুরায় সিএএ-র আওতায় প্রথম নাগরিকত্ব প্রদান: চাঞ্চল্যকর প্রশ্ন তুললেন বিধায়ক রঞ্জিত দেববর্মা, নিয়ম ও প্রক্রিয়া স্পষ্ট করলেন আদমশুমারি অধিকর্তা

গোপল সিং, খোয়াই, ১৫ জুন || নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন তথা সিএএ (CAA) কার্যকর হওয়ার পর ত্রিপুরায় এই প্রথম অফিশিয়ালি দুই বাংলাদেশী আবেদনকারীকে ভারতের নাগরিকত্ব প্রদান করা হলো। উত্তর ত্রিপুরা জেলার বাসিন্দা এই দুই নাগরিককে নাগরিকত্বের শংসাপত্র দেওয়ার খবরটি প্রশাসনিকভাবে নিশ্চিত হতেই রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক অলিন্দে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। একদিকে যখন এই ডিজিটাল প্রক্রিয়ার প্রথম সাফল্য সামনে এসেছে, ঠিক তখনই এই নাগরিকত্ব প্রদানের নেপথ্য তথ্য ও গোপনীয়তা নিয়ে সরব হলেন তিপ্রামথা পার্টির (TMP) অন্যতম শীর্ষ নেতা তথা বিধায়ক রঞ্জিত দেববর্মা।
ত্রিপুরায় এই সিএএ-র আওতায় নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতেই তীব্র আপত্তি ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন তুলে সরব হয়েছেন তিপ্রামথা পার্টির বিধায়ক রঞ্জিত দেববর্মা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “কারো ভারতীয় নাগরিক হওয়াতে আইনি কোনো দোষ নেই। কিন্তু একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং জনজাতির সুরক্ষার স্বার্থে আমার মনে কিছু সুনির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে, যা রাজ্যবাসীর জানা উচিত।” তিনি মূলত ৪টি বড় প্রশ্ন প্রশাসন ও আদমশুমারি অধিকর্তার উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিয়েছেন। প্রথমত, অনলাইনে ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদনকারী এই বাংলাদেশিদের—যাদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিদেশী বা বাংলাদেশী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে—নাগরিকত্ব পাওয়ার আগে কি নিয়ম মেনে ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হয়েছিল? যদি রাখা হয়ে থাকে, তবে তারা সেখানে কত দিন ছিলেন?
দ্বিতীয়ত, ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রাপ্ত এই বাংলাদেশিরা ঠিক কোন সাল থেকে ত্রিপুরায় বা ভারতে অননুমোদিতভাবে বসবাস করছেন? এ বিষয়ে রাজ্য বা জেলা প্রশাসনের কাছে কোনো স্পষ্ট পরিসংখ্যান বা জনসমক্ষে তথ্য কেন নেই?
তৃতীয়ত, এই ব্যক্তিরা ঠিক কী কারণে বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নথিতে বা জনসমক্ষে কেন আনা হলো না? এই পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কেন এত গোপন রাখা হচ্ছে?
চতুর্থত, ভারতীয় নাগরিকত্ব অর্জনকারী এই বাংলাদেশিদের বিষয়ে ত্রিপুরা স্বশাসিত জেলা পরিষদ এলাকার বাইরে সামগ্রিক রাজ্যে কোনো স্পষ্ট ও উন্মুক্ত তথ্য নেই কেন? কেন বিষয়টি রাখঢাক না করে স্পষ্টভাবে সাধারণ মানুষকে জানানো হচ্ছে না?
বিধায়ক রঞ্জিত দেববর্মা আশা প্রকাশ করেন যে, রাজ্যের আদমশুমারি অধিকর্তা রতন বিশ্বাস যদি প্রেসমিট করে জনসমক্ষে এই সমস্ত প্রশ্নের আইনি ও তথ্যভিত্তিক স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন, তবে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে তৈরি হওয়া সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি ও আশঙ্কার সঠিক বিশ্লেষণ হবে।
রাজ্যের স্টেট লেভেল এমপাওয়ার্ড কমিটির চেয়ারম্যান তথা আদমশুমারি অধিকর্তা রতন বিশ্বাস সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে এই ঐতিহাসিক নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সম্পূর্ণ অনলাইন এবং ‘জিরো-অফলাইন প্রোটোকল’ মেনে এই যাচাইকরণ প্রক্রিয়া চলছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দিষ্ট পোর্টালের মাধ্যমে ত্রিপুরা থেকে মোট ২৪টি আবেদন জমা পড়েছিল। তার মধ্যে সমস্ত স্ক্রিনিং সফলভাবে পার করায় উত্তর ত্রিপুরা জেলার দুই বাসিন্দা—ঝলক দাস চৌধুরী এবং সীমা রাণী বণিককে অফিশিয়ালি ভারতের নাগরিকত্বের শংসাপত্র প্রদান করা হয়েছে। আরও একটি আবেদন ছাড়পত্রের জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং বাকি ২১-২২টি আবেদন বর্তমানে স্ক্রিনিং প্রক্রিয়ার অধীনে মূল্যায়নাধীন রয়েছে। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নাগরিকত্ব পাওয়ার পর ঝলক দাস চৌধুরী ইতিমধ্যেই উত্তর ত্রিপুরা জেলার জেলাশাসকের সাথে দেখা করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ভারতীয় পরিচয়পত্র তথা আধার কার্ড সংক্রান্ত প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছেন। কেন্দ্রীয় নিয়ম অনুযায়ী, এই আবেদনগুলি প্রথমে পোস্ট অফিসের সুপারিটেনডেন্টের নেতৃত্বাধীন জেলা স্তরের কমিটি দ্বারা বহু-স্তরীয় যাচাইকরণের মধ্য দিয়ে যায় এবং সবশেষে রাজ্য কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পৌঁছায়।
এই বিতর্কের আবহে সিএএ-র আইনি দিকটি খতিয়ে দেখলে দেখা যায়, ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) অনুযায়ী, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান থেকে আসা ধর্মীয় সংখ্যালঘু তথা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অবৈধ অভিবাসীরা ভারতের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার যোগ্য। তবে এই আইনের প্রধান শর্ত হলো, আবেদনকারীকে অবশ্যই ৩১শে ডিসেম্বর, ২০১৪ ইং তারিখ বা তার আগে ভারতে প্রবেশ করে থাকতে হবে। মূলত এই আইনি পরিমাপক মেনেই উত্তর ত্রিপুরার প্রথম দুজনকে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে বলে দাবি প্রশাসনের। এখন দেখার, বিধায়ক রঞ্জিত দেববর্মার এই ৪টি প্রশ্নের জবাবে রাজ্য প্রশাসন বা সেন্ট্রাল এমপাওয়ার্ড কমিটি নতুন কোনো স্পষ্টীকরণ জারি করে কিনা।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*