উন্নয়নের আলো পৌঁছায়নি সেনপাড়ায়: সরকারি বঞ্চনায় দিন কাটছে দৃষ্টিহীন বৃদ্ধার

সুব্রত দাস, গন্ডাছড়া, ২১ জানুয়ারি || গন্ডাছড়া মহকুমার জনজাতি অধ্যুষিত প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছানো আজও সংবাদ প্রতিনিধিদের কাছে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। দুর্গম রাস্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব ও প্রশাসনিক উদাসীনতার মধ্যেই বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে গতকাল আমাদের সংবাদ প্রতিনিধি পৌঁছান তুইচাকমা এডিসি ভিলেজের সেনপাড়ায়। সেখানে উঠে আসে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য, যা উন্নয়নের দাবিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
ভোট আসে, ভোট যায়। কখনও জাতির নামে, কখনও উন্নয়নের নামে ভোট চাওয়া হয়। অথচ বাস্তবে সেই উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছায় না প্রত্যন্ত এলাকার প্রান্তিক মানুষের জীবনে। সেনপাড়ায় বসবাসকারী ৮০ বছরের দৃষ্টিহীন বৃদ্ধা সুজি মুখী চাকমার জীবন সেই নির্মম বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
চোখে দেখতে না-পাওয়া এই বৃদ্ধা বছরের পর বছর কাটাচ্ছেন এক জীর্ণ, ভাঙাচোরা টং ঘরে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যাঁর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল সরকারি সহানুভূতি ও সহায়তা, তাঁর ভাগ্যে জোটেনি ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা। নেই সরকারি বৃদ্ধভাতা, নেই রেশন কার্ড, নেই আবাস যোজনার ঘর। সরকারি সাহায্যের তালিকায় তাঁর নাম কার্যত অনুপস্থিত।
একটি মাত্র রেগা জব কার্ডই তাঁর একমাত্র সরকারি নথি। সেই সামান্য ভরসাতেই কোনোমতে দিন কাটাচ্ছেন তিনি ও তাঁর পরিবার। তাঁর দেখাশোনার সমস্ত দায়িত্ব একমাত্র মেয়ের কাঁধে। অথচ রাজ্যজুড়ে শীতবস্ত্র বিতরণ ও বিভিন্ন প্রকল্পের প্রচারে প্রশাসনের সক্রিয়তা চোখে পড়লেও সেনপাড়ার এই বৃদ্ধার কপালে জোটেনি একটি কম্বলও। প্রশ্ন উঠছে—এই উন্নয়ন আসলে কাদের জন্য?
এলাকার আরেকটি গুরুতর সমস্যা পানীয় জলের সংকট। সেনপাড়ায় পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানীয় জলের কোনো ব্যবস্থা নেই। দীর্ঘদিন ধরে এলাকার জল পাম্প বিকল হয়ে পড়ে থাকলেও তা সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিষয়টি প্রশাসনের জানা থাকলেও কার্যত কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। ফলে পানীয় জলের মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন এই জনজাতি অধ্যুষিত এলাকার মানুষজন।
সেনপাড়ার এই করুণ চিত্র শুধু একটি পরিবারের দুর্দশার কথা বলে না, বরং গোটা ব্যবস্থার ব্যর্থতাকেই সামনে আনে। সরকারি বিজ্ঞাপন, উন্নয়নের দাবি ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার যে বিস্তর ফারাক—তা এখানেই স্পষ্ট। যদি সত্যিই উন্নয়ন হতো, তবে কি ৮০ বছরের এক দৃষ্টিহীন বৃদ্ধাকে এভাবে অনাহারে-অনাদরে দিন কাটাতে হতো? যদি প্রশাসন মানুষের পাশে দাঁড়াত, তবে কি আজও সেনপাড়ার মানুষ বিশুদ্ধ পানীয় জলের জন্য হাহাকার করত?
সেনপাড়ার এই দৃশ্য রাজ্যের শাসক থেকে প্রশাসন—সবার কাছেই এক নীরব কিন্তু তীব্র প্রতিবাদ। উন্নয়নের নামে আত্মপ্রচার নয়, প্রয়োজন বাস্তব ও মানবিক উদ্যোগ। নচেৎ ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি যে কেবল ফাঁকা বুলি—সেই সত্যই বারবার সামনে এসে দাঁড়াবে।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*