যশপাল সিং, খোয়াই, ২৭ জানুয়ারি || বলিউড তথা ভারতীয় সংগীত জগতের এক আবেগঘন অধ্যায়ের আজ পরিসমাপ্তি ঘটল। জনপ্রিয় প্লেব্যাক গায়ক অরিজিৎ সিং আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করলেন—তিনি আর কোনও নতুন প্লেব্যাক গান গাইবেন না। ইনস্টাগ্রামে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে দেওয়া এক পোস্টে তিনি শ্রোতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে লেখেন, “আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে আর কোনও নতুন কাজ নেব না। এটি একটি চমৎকার যাত্রা ছিল।” এই ঘোষণায় স্বাভাবিকভাবেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে সংগীতপ্রেমী মহল।
শুরুটা যেখানেঃ
১৯৮৭ সালের ২৫ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার জিয়াগঞ্জে জন্ম অরিজিৎ সিংয়ের। বাবা পাঞ্জাবি ও মা বাঙালি—দু’জনেই সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শৈশব থেকেই শাস্ত্রীয় সংগীত, তবলা ও রবীন্দ্রসংগীতে দীক্ষা নেওয়া অরিজিতের সংগীতযাত্রার ভিত্তি তৈরি হয় খুব অল্প বয়সেই।
২০০৫ সালে রিয়ালিটি শো Fame Gurukul-এ অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় পরিচিতি পেলেও, প্রকৃত সাফল্য আসে বহু বছর পর।
বলিউডে উত্থান ও সুপারস্টার হয়ে ওঠাঃ
২০১৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আশিকি ২ ছবির গান “তুম হি হো”—এই একটি গানই অরিজিৎ সিংকে রাতারাতি সুপারস্টারে পরিণত করে। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
পরবর্তী এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি উপহার দিয়েছেন— “চন্না মেরেয়া”, “আগার তুম সাথ হো”, “মুসকুরানে”, “রাবতা”, “ফির লে আয়া দিল”, “কেশরিয়া”, “আপনা বানালে”, “শায়াদ” সহ অসংখ্য কালজয়ী গান।
কত ভাষায় ও কত গান?
অরিজিৎ সিং শুধু বলিউডের নন—তিনি সর্বভারতীয় কণ্ঠ।
ভাষাঃ
তিনি মোটামুটি ২০টিরও বেশি ভাষায় গান গেয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য— হিন্দি, বাংলা, তামিল, তেলুগু, মালয়ালম, কন্নড়, মারাঠি, গুজরাটি, পাঞ্জাবি, ওড়িয়া, অসমীয়া, উর্দু, নেপালি প্রভৃতি।
গানের সংখ্যাঃ
বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, তিনি ১,০০০–এরও বেশি চলচ্চিত্র ও অ্যালবাম গান রেকর্ড করেছেন—যা আধুনিক যুগের প্লেব্যাক গায়কদের মধ্যে বিরল।
পুরস্কার ও সম্মানঃ
অরিজিৎ সিংয়ের ঝুলিতে রয়েছে অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মান— জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার,২০১৯– “কেশরিয়া” (ব্রহ্মাস্ত্র)। ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড (৭ বার-এর বেশি) —“তুম হি হো”, “চন্না মেরেয়া”, “আগার তুম সাথ হো” সহ একাধিক হিট গানের জন্য
আইফা, জি সিনে, স্টার স্ক্রিন, মিরচি মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস —প্রায় প্রতি বছরই কোনও না কোনও বিভাগে। এছাড়াও তিনি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় স্ট্রিমিং শিল্পী হিসেবে বহু আন্তর্জাতিক চার্টে স্থান পেয়েছেন।
সঙ্গীত জীবনের বিরাট প্রাপ্তিঃ
অরিজিৎ সিংয়ের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কোনও পুরস্কার নয়— শ্রোতার সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক তৈরি করা।
ভালবাসা, বিচ্ছেদ, নিঃসঙ্গতা, আত্মসংঘর্ষ—মানুষের জীবনের সবচেয়ে নীরব অনুভূতিগুলোকে তিনি কণ্ঠে রূপ দিয়েছেন।
তাঁর গান প্রজন্মের পর প্রজন্মের প্লেলিস্টে জায়গা করে নিয়েছে।
আর এক বিরাট অর্জন—স্টারডমের মাঝেও সম্পূর্ণ নির্লোভ ও সাধারণ জীবনযাপন, মিডিয়া ও প্রচারের আলো থেকে সচেতন দূরত্ব, সংগীতকে ব্যবসা নয়, সাধনা হিসেবে দেখা।
বিদায়, তবে শেষ নয়ঃ
প্লেব্যাক থেকে বিদায় নিলেও অরিজিৎ সিং যে সংগীত থেকে সরে যাচ্ছেন—তা তিনি কোথাও বলেননি। তাই অনেকেই মনে করছেন, ভবিষ্যতে হয়তো তাঁকে দেখা যাবে— স্বাধীন সঙ্গীত, লাইভ কনসার্ট, সুরকার বা মেন্টর রূপে।
আজ বলিউড প্লেব্যাকের এক অধ্যায় শেষ হলো।
কিন্তু অরিজিৎ সিং—তিনি থেকে যাবেন আমাদের প্লেলিস্টে, স্মৃতিতে, আর হৃদয়ের গভীরে।
এক চমৎকার যাত্রার জন্য ধন্যবাদ, অরিজিৎ।
