খোয়াই জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা বঞ্চনার অভিযোগ, অসুস্থ বৃদ্ধদের তাড়ানোর ঘটনায় মেডিক্যাল সুপারের বিরুদ্ধে বিতর্ক

গোপাল সিং, খোয়াই, ২২ মার্চ || খোয়াই জেলা হাসপাতালে ১২ থেকে ১৫ বছর যাবত আশ্রয় নিয়ে থাকা দুই অসুস্থ বৃদ্ধকে চিকিৎসা না দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে জনমনে। মানবিকতা ও চিকিৎসা পরিষেবার দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন খোয়াইয়ের সচেতন নাগরিকরা। যতদিন তারা সক্ষম ছিল, চলাচল করতে পারতো তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি। যখনই তারা অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হলো, ঠিক তখন কোনো স্বাস্থ্য পরিসেবা প্রদান না করে, হাসপাতালের মেডিক্যাল সুপারিন্টেন্ডেন্ট ড. স্বরবিন্দু রিয়াং তাদের তাড়িয়ে দিচ্ছেন। উপরন্তু, তাদের তাড়িয়ে দিতে মেডিক্যাল সুপারিন্টেন্ডেন্ট পুলিশের নিকট অভিযোগ জানিয়েছেন বলে জানা যায়।
জানা গেছে, গত প্রায় ১২-১৫ বছরের উপর খোয়াই জেলা হাসপাতালের অভ্যন্তরে বসবাস করছেন দুই বয়স্ক ব্যক্তি। তাঁদের মধ্যে একজন শারীরিকভাবে প্রায় ৬০ শতাংশ প্রতিবন্ধী, অপরজন দীর্ঘদিন ধরে স্নায়ুজনিত সমস্যায় ভুগছেন। অভিযোগ, এতদিন হাসপাতালে থাকলেও তাঁরা পর্যাপ্ত চিকিৎসা পরিষেবা পাননি, বরং সম্প্রতি হাসপাতালের মেডিক্যাল সুপারিন্টেন্ডেন্ট ড. স্বরবিন্দু রিয়াং তাঁদের হাসপাতাল থেকে চলে যেতে বলছেন। শুধু তাই নয় দুর-দুর করে তাড়িয়ে দিচ্ছেন। এনজিওকে না জানিয়ে, অমানবিকভাবে পুলিশে অভিযোগ জানিয়ে তাদের তাড়ানোর প্রচেষ্টা মেডিক্যাল সুপারিন্টেন্ডেন্টের।
খবর নিয়ে জানা যায়, প্রথম ব্যক্তির নাম প্রদীপ চক্রবর্তী (৬৫)। তাঁর বাড়ি কল্যানপুর থানার খামারটিলা, লক্ষ্মীনারায়ণপুর গ্রামে। তিনি স্নায়ুজনিত সমস্যায় ভুগছেন, তিনি ১২-১৫ বছর ধরে খোয়াই জেলা হাসপাতালে আশ্রিত। নিজের পরিচয় দিতে অক্ষম এই ব্যক্তি স্থানীয় সহানুভূতিশীল মানুষের দেওয়া আর্থিক সহায়তা জমিয়ে নিজের চিকিৎসা খরচ বহনের ইচ্ছা প্রকাশ করলেও, অভিযোগ অনুযায়ী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁর চিকিৎসায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
অন্যদিকে, আরেকজন হলেন সন্তোষ শুক্লদাস। আনুমানানিক ষাটোর্ধ, বৃদ্ধ ব্যক্তি। তিনি জানিয়েছেন, পারিবারিক অশান্তি ও ছেলের নেশাগ্রস্ত জীবনের কারণে প্রায় ১২ বছর আগে তিনি হাসপাতালেই আশ্রয় নেন। নেশার কারনেই তাঁর এক ছেলে মারা গেছেন এবং অন্য ছেলেও নেশার কবলে। বর্তমানে তাঁর নিজের বয়স্ক স্ত্রী গোপনে এসে তাঁকে খাবার দিয়ে যান। তিনি আজ পর্যন্ত হাসপাতালের খাবার খাননি। তবে দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা থাকা সত্ত্বেও তিনি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত বলেই অভিযোগ।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, একজন চিকিৎসকের প্রথম দায়িত্ব যেখানে রোগীর জীবন রক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা, সেখানে কেন এমন আচরণ করা হচ্ছে। যদিও প্রশ্ন উঠছে স্থানীয় সচেতন মহলকে নিয়েও।
এদিকে গোটা বিষয়টিতে আইনগত দিক থেকেও অনেক প্রশ্ন উঠেছে। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত প্রযোজ্য আইনের ১০২ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি মানসিক অসুস্থতায় ভুগলে বা আশ্রয়হীন অবস্থায় থাকলে, দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসা আধিকারিকের কর্তব্য হচ্ছে তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। এমনকি পরিচয়হীন বা গৃহহীন ব্যক্তির ক্ষেত্রে পুলিশকে অবহিত করে পরিবারের সন্ধান করা বা সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থাও করার কথা বলা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন কি না। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একইসঙ্গে, দুই অসুস্থ বৃদ্ধের দ্রুত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*