বিজ্ঞান ও পরিবেশে অনন্য অবদান, রাজ্য পুরস্কারে ভূষিত ড. অরিজিত দাস

আপডেট প্রতিনিধি, আগরতলা, ২৬ জানুয়ারি || স্কুলজীবন থেকে শুরু করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়—প্রতিটি স্তরেই মেধা, অধ্যবসায় ও গবেষণায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন ‘ছাত্র অরিজিত’। পরবর্তীকালে গবেষণার ক্ষেত্রেও তিনি রাজ্যের নাম উজ্জ্বল করেছেন দেশ–বিদেশের নামী প্রতিষ্ঠানে। সেই ধারাবাহিক সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ ত্রিপুরা পূর্ণরাজ্য দিবসে বিজ্ঞান ও পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য রাজ্য পুরস্কারে সম্মানিত হলেন ড. অরিজিত দাস।
রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে আয়োজিত পূর্ণরাজ্য দিবসের মূল অনুষ্ঠানে ড. দাসের হাতে এই সম্মান তুলে দেওয়া হয়। তাঁর গবেষণা ও উদ্ভাবনী কাজ উপস্থিত সকলকে অনুপ্রাণিত করে। এই পুরস্কার প্রাপ্তিতে বীর বিক্রম মেমোরিয়াল কলেজের ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে অধ্যাপক-অধ্যাপিকারা বিশেষভাবে উৎসাহিত হয়েছেন। এদিন পড়ন্ত বিকেলে কলেজ প্রাঙ্গণেই তাঁকে বিশেষ সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয় এবং সহকর্মী ও ছাত্রছাত্রীরা তাঁকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান।
উল্লেখ্য, ড. অরিজিত দাসের জন্ম ১৯৭৮ সালের ১৪ মার্চ। উনকোটি জেলার কৈলাসহরের কাছারঘাটে তাঁর জন্ম। পিতা প্রয়াত অনিল রঞ্জন দাস ও মাতা সুলেখা দাস। তিনি একজন খ্যাতনামা রাসায়নিক শিক্ষাবিদ এবং বিশেষত অজৈব রসায়নবিদ। বর্তমানে আগরতলাস্থিত বীর বিক্রম মেমোরিয়াল কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক (অজৈব রসায়ন) পদে কর্মরত রয়েছেন।
ড. দাস ১৯৯৮, ২০০১ ও ২০০৮ সালে ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যথাক্রমে বিএসসি, এমএসসি ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন বিজ্ঞান বিভাগের ডিন ও ভিসি-ইনচার্জ অধ্যাপক এম. কে. সিং-এর তত্ত্বাবধানে তিনি ২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত “সিনথেটিক অজৈব ল্যাবরেটরি”-তে স্নাতকোত্তর গবেষণা সম্পন্ন করেন। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে উত্তর ত্রিপুরার ধর্মনগরের সরকারি ডিগ্রি কলেজে রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পিএইচডি করার সময় তিনি ২০০২-২০০৪ সাল পর্যন্ত ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পিএমএলপিএম’ গবেষণা ফেলোশিপ লাভ করেন।
শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণাক্ষেত্রেও ড. দাসের অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তরের (DST-SERB) দুটি গবেষণা প্রকল্পের প্রধান তদন্তকারী ছিলেন, যার মোট আর্থিক মূল্য ৪৬ লক্ষ টাকারও বেশি (২০১৩-২০১৫ ও ২০২২-২০২৫)। তিনি ডিসেম্বর ২০১৩ থেকে আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির মনোনীত সদস্য।
এখনও পর্যন্ত তিনি ৬৫টিরও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন, ২২টি নতুন শিক্ষাদান পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন এবং জৈব, অজৈব ও ল্যাবরেটরি রসায়ন শিক্ষার ক্ষেত্রে ৪০টি নতুন সূত্র প্রস্তাব করেছেন। পাশাপাশি তিনি ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৬টি উন্নত ইউজি ‘সবুজ’ ল্যাবরেটরি পরীক্ষার প্রস্তাব দেন। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি দুটি এআই-ভিত্তিক বিনামূল্যের শিক্ষামূলক সরঞ্জামও চালু করেছেন। তাঁর লেখা তিনটি বই—যার একটি ইংল্যান্ড ও একটি জার্মানি থেকে প্রকাশিত—বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার যেমন এমআইটি, ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন, স্ট্যানফোর্ড, অক্সফোর্ড, হার্ভার্ড ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (ডেভিস) দ্বারা সূচিত হয়েছে।
এর আগে কপিরাইট অফিস (ভারত সরকার), আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি, ইন্ডিয়ান কেমিক্যাল সোসাইটি, ফেডারেশন অফ আফ্রিকান সোসাইটিজ অফ কেমিস্ট্রি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা বিভাগসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে তিনি স্বীকৃতি পেয়েছেন। ২০২১ সালের ৬ মে থেকে তিনি ‘উইকিএডুকেটর’-এর নিয়মিত লেখক এবং নিউজিল্যান্ডভিত্তিক এই প্ল্যাটফর্মে ইতোমধ্যে ৩৪টি অধ্যায় রচনা করেছেন।
এদিকে, জানুয়ারি ২৪ তারিখে কেন্দ্রীয় যোগাযোগ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়ন মন্ত্রী শ্রী জ্যোতিরাদিত্য এম. সিন্ধিয়ার আমন্ত্রণে আগরতলার একটি হোটেলে তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ড. দাস। সাক্ষাৎকালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বিশ্বজুড়ে রসায়ন শিক্ষায় তাঁর উদ্ভাবনী শিক্ষণ-পদ্ধতির প্রশংসা করেন। পরে ড. দাস তাঁর গবেষণা ও শিক্ষাদান সংক্রান্ত একটি বইয়ের ক্যাটালগ মন্ত্রীর হাতে তুলে দেন।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ডা. মানিক সাহা তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ড. দাসকে অভিনন্দন জানিয়ে লেখেন, “উদ্ভাবন ও গবেষণায় অসামান্য কৃতিত্বের জন্য এ বছরের বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশগত কার্যক্রমে রাজ্য পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন ড. অরিজিত দাস। তিনি শুধু রাজ্যেই নন, বিশ্ববিজ্ঞানের অঙ্গনেও ত্রিপুরার গর্ব।”
পূর্ণরাজ্য দিবসের মঞ্চে ড. অরিজিত দাসকে এই সম্মানে ভূষিত করা রাজ্যের বিজ্ঞানচর্চা ও শিক্ষাক্ষেত্রে এক গর্বের অধ্যায় বলেই মত সংশ্লিষ্ট মহলের।

FacebookTwitterGoogle+Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*